কমেছে ধানের দাম, চালের দাম চড়া!

riceওয়ান নিউজ বিডি, ময়মনসিংহ : ভরা মৌসুমে ধানের দাম কমতে শুরু হলেও গরম হয়ে উঠেছে ময়মনসিংহের চালের বাজার। ধানের দাম পড়ে যাবার ন্যূনতম প্রভাব পড়েনি শহরের পাইকারি চালের আড়তে। ধান-চালের দামের এমন বৈপরীত্যের কারণে ঠকতে হচ্ছে কৃষকদের।

স্থানীয় খুচরা ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়ার পেছনে দোষারোপ করছেন আড়তদারদের। আবার আড়তদাররা দায়ী করছেন কৃষকের গোলা শূন্য করে কম দামে চাল কেনা চাতাল ও অটো চাল মিল মালিকদের বিশেষ সিন্ডিকেটকে। তিন পক্ষের দোষারোপে চালের ঊর্ধ্বগতির ঘানি টানতে হচ্ছে ক্রেতাদের। সহসাই এ দাম কমারও কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না কেউই।

জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় বোরোর ফলন হয়েছে ভালো। অথচ বাজারে ধানের দাম একেবারে পড়তির দিকে। বাজারে চাল সরবরাহেও কোনো ঘাটতি নেই। ভারত থেকে চাল আমদানি ও আমন মৌসুমের চাল এখনো গুদামে মজুদ থাকায় হঠাৎ করেই বাজারে ওঠা নতুন চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় আড়তদাররা।

চালের আড়তের দামের এ প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। চাল কিনতে গিয়ে অল্প আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তরা পড়ছেন দুভোগে। কেজি প্রতি তাদের ৩ থেকে ৪ টাকা বাড়তি গুণতে হচ্ছে।

সূত্র জানায়, বাড়তি লাভের আশায় প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুদ করা অটো মিল মালিকদের সিন্ডিকেট চালের বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তাদের কারসাজির কারণেই যে হারে ধানের দাম কমেছে সেই অনুপাতে চালের দামের ওপর কোনো প্রভাব পড়েনি।

শনিবার (০৯ মে) রাতে ময়মনসিংহ শহরের হিজবুল্লাহ রোডের চালের আড়তে গিয়ে জানা গেলো, ত্রিশাল, চুরখাই, তারাকান্দা, ফুলপুর, নেত্রকোণাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ ট্রাক চাল আসছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বস্তাপ্রতি নতুন আটাশ চালের দাম ১ হাজার ২’শ ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৪’শ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

ভরা মৌসুমে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ না থাকলেও বস্তাপ্রতি দেড়শ টাকা বেশি নিচ্ছেন আড়ত মালিকরা।

দাম বাড়ার কারণ সম্পর্কে এ বাজারের মেসার্স দাদা এন্টার প্রাইজের সত্ত্বাধিকারী অখিল দেবনাথ জানান, ধান থেকে চাল তৈরি করলে বস্তায় এক’শ টাকা লোকসান যায় মিল মালিকদের। এছাড়া ধান থেকে চাল প্রক্রিয়াকরণ খরচ বেড়ে যাওয়া, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিক খরচাসহ সব মিলিয়ে চালের দাম বেড়েছে।

তিনি জানান, দুদিন আগেও নতুন আটাশ জাতের এক মণ ধানের দাম ছিল ৫’শ ৫০ টাকা। এখন সেই ধানের দাম বেড়ে হয়েছে ৬’শ ৫০ থেকে ৬’শ ৮০ টাকা। ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় চালের দামও বস্তাপ্রতি ১’শ থেকে দেড়শ টাকা বেড়েছে। একই রকম মন্তব্য মেসার্স বিমল ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী বিমল পালের।

নতুন চালে ঠাসা এক আড়তে বসেছিলেন স্থানীয় শ্যামগঞ্জ এলাকার মিলার আজাদ রহমান। তিনি জানান, গত বছর ধানের দাম বেশি ছিল। এবার চালের দাম কম। আর দু’মণ ধানে এক বস্তা চাল হয়। এ কারণেই সেই হিসেব করেই পাইকারি বাজারে চালের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।

শম্ভুগঞ্জের মিলার মিন্টু ঘোষ দাবি করেন, এক শ্রেণীর অটো রাইস মিল মালিকরা কম দামে ধান কিনে মজুদ করছেন। মাসখানেক পরে তারা চড়া দামে ধান থেকে চাল বানিয়ে বিক্রি করবেন।

ময়মনসিংহের তারাকান্দা ও ফুলপুর উপজেলায় রয়েছে কম করে হলেও ৩’শ চাতাল ও অটো রাইস মিল। কাশিগঞ্জ, আলালপুর, রামভদ্রপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এসব। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় অর্ধ-শতাধিক চাতাল ও অটো মিল মালিক চাল মজুদ করছেন।

বাজারে এসব অটো মিল মালিকরাই কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার অনেক কৃষক ধান বিক্রি না করে ভালো দামের আশায় ধরে রেখেছেন।

‘ধান-চালের দামের বিস্তর ফারাকের বিষয়ে তারাকান্দার ফকির অটো রাইস মিলের সত্ত্বাধিকারী মানিক সরকার জানান, বড় বড় মিলাররা কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে মজুদ করছে। ২ থেকে ৩ মাস পর যখন কৃষকের ঘরে ধান থাকবে না তখন এ চাল ১ হাজার ৬’শ থেকে ১ হাজার ৭’শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করবে।

এ কারণে এখন ধানের দাম কম। সরকার ধান কেনা শুরু করলেই বাজারে চাঙ্গাভাব ফিরে আসবে। তখন কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টির অপচেষ্টাকারী মধ্যস্বত্ত্বভোগী ওই সিন্ডিকেট সুবিধা করতে পারবে না।

জানতে চাইলে ময়মনসিংহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আলতাবুর রহমান বলেন, এখন ধান ভেজা থাকায় চালের দাম বেশি। ধান শুকিয়ে গেলে দুটোর দামে খুব একটা পার্থক্য থাকবে না। এছাড়া মধ্যস্বত্ত্বভোগী মিল মালিক সিন্ডিকেটরা বাজারে নতুন চাল উঠলেও দামে কারসাজি করছেন।

যোগাযোগ করলে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাবেক উপ-পরিচালক ও এখন একটি জেলার অতিরিক্ত পরিচালক আবুল হোসেন চালের দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই বলেই মনে করেন।

তিনি বলেন, ধানের দাম কমিয়ে মিল মালিকরা ধান কেনার কৌশল নিয়েছেন। এতে করে কৃষক ঠকছে। এ সিন্ডিকেটই আবার চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]