সিঙ্গাপুরের মত যশোর শহর গড়তে চান হিরক

Jessore S M Rofiqul Islam Hirokস্টাফ রিপোর্টার, যশোর: সততা আর কঠোর পরিশ্রম একজন মানুষকে সাফল্যের শীর্ষে উঠতে পারে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যশোরের এস এম রফিকুল ইসলাম হিরক। সততার সাথে পরিশ্রমের মিলন ঘটিয়ে তিনি আজ একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। শুধু ব্যবসায়ী মহল নয়, সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তিনি এক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। সমাজের প্রায় সকল ভালো কাজের সাথে জড়িত তিনি।

খেলাধুলা ছাড়া কিছুই বোঝেন না ব্যবসায়ী এস এম রফিকুল ইসলাম হিরক। এক সময়ে যশোর জেলা ফুটবল দলের গোলকিপার ছিলেন তিনি। আর সেই থেকে খেলাধুলার সাথে তার নাড়ির সম্পর্ক। ফুটবলে তার প্রিয় দল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ আসরের পর্দা উঠার আগেরদিন তিনি শহরের আয়োজন করেন বিশাল এক শোভাযাত্রার। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের ‘অন্ধ’ সমর্থক হিরক শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের সকলকেই তার সমর্থিত দলের জার্সি পরিয়েছিলেন। তৈরি করেছিলেন ১৬০ ফুট দৈর্ঘ্যরে বিশাল পতাকা। খেলোয়াড়-সমর্থকদের মাঝে বিতরণ করেছেন কয়েক হাজার জার্সি ও শতাধিক ফুটবল। বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের সময় তিনি জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত: ২৫ টুর্নামেন্টের আয়োজন করেন। শুধু তাই নয়, ফুটবলপ্রেমীদের খেলা দেখার সুবিধার্থে শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন স্থানে দিয়েছিলেন জায়ান্ট স্কিন।

Jessore S M Rofiqul Islam Hirokশুধু কি তাই ? ফুটবল খেলাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে শহর ছাড়িয়ে গ্রামপর্যায়ে আয়োজন করেছেন প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। এমনই বিভিন্ন প্রীতি ম্যাচে অংশ নেয় আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল সমর্থিত দুটি দলে বিভক্ত হয়ে। এসব ম্যাচে তিনি নিজে খেলেছেন। তিনি সব সময়ই গোলকিপার হন। যশোর শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম, কেন্দ্রীয় ঈদগাহেও হয়েছে এমন প্রীতি ম্যাচ। ঈদগাহের ম্যাচে তার ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও সাংবাদিকরা টপ ফেভারিট ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে খেলেন। তার সুবাদে দীর্ঘদিন পর খেলায় অংশ নেয় যশোরের সাংবাদিকরা। এরপর পর্যায়ক্রমে হাশিমপুর স্কুল মাঠ, ছাতিয়ানতলা স্কুল মাঠ, রাজারহাট স্কুল মাঠ এবং ভেকুটিয়া স্কুল মাঠে এমন প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।

ফুটবল নিয়ে কেন তার এই উন্মাদনা ? এমন প্রশ্ন ছিল তার কাছে। বিষয়টি পরিষ্কার করনে হিরক।

তিনি জানান, ‘আমার রক্তের মধ্যে রয়েছে ফুটবল। বাবা সৈয়দ মনিরুল ইসলাম যিনি রুনু নামেই পরিচিত। তিনিও ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। লেফট ব্যাকে খেলতেন।’

S M Rofiqul Islam Hirokএকবার ৪৪ গজ দূর থেকে বাবার এক শটে গোলের নেট ছিঁড়ে যায়-যোগ করেন তিনি।
হিরক যশোর জেলা যুব ফুটবল দলের গোলকিপার ছিলেন। ১৯৮৭ সালের অক্টোবরে ঢাকা যান ফুটবল খেলতে ওয়ান্ডারাস-এর হয়ে। সে বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল মাঠে প্রাকটিসের সময় তার বাম হাতের জয়েন্টটি (কাঁধ থেকে) সরে যায়। ৯০’ সাল পর্যন্ত খেলেছেন। কিন্তু হাতের সমস্যার কারণে পরে আর নিয়মিত খেলা হয়ে ওঠে নি।

তার মতে, ‘গোলকিপারের হাতটাই হলো মূল; তাই যদি ঠিক না থাকে-তবে খেলা কি আর হয়?’
যশোরের এক সময়ের কৃতী ফুটবলার বর্তমানে রেফারি লাবু জোয়ার্দার বলেন, ‘ফুটবলের প্রতি তার (হিরক) রয়েছে অভূতপূর্ব ভালবাসা। তার মত বিত্তশালীদের আরও বেশি বেশি এগিয়ে আসা দরকার।’

তিনি আরও বলেন, ‘ফুটবলটাকে আর নিজে মাঠে গড়াতে না পারলেও অন্যকে খেলানোর প্রচ- আগ্রহ রয়েছে তার। সেকারণে যশোরের শৌখিন ক্রীড়াচক্র, শেখ রাসেল স্মৃতি সংসদ, জেলা ফুটবল দল, মহিলা ফুটবল দল-যারাই ফুটবল খেলা নিয়ে আছেন, সবাইকে লজিস্টিক দিয়ে সাধ্যমত সহযোগিতা করছেন তিনি।’

এ বছর যশোর স্টেডিয়ামে ১২ স্কুলের সমন্বয়ে যৌথভাবে তার প্রতিষ্ঠান টুর্নামেন্ট আয়োজন করে। সোনালী দিনের খেলোয়াড়দের সাথে নতুন প্রজন্মের দলের জাঁকজমক খেলা সম্পন্ন হয়েছে তার উদ্যোগে। বেশ গান-বাজনারও আয়োজন ছিল।

হিরক জানান, ফুটবল আমাদের দেশের খুবই জনপ্রিয় খেলা। বিত্তশালীরা এগিয়ে এলে এ খেলার উন্নয়ন সম্ভব।

তার মতে, কেবল স্টেডিয়ামকেন্দ্রিক নয়, ফুটবলকে নিয়ে যেতে হবে গ্রাম পর্যায়ে, প্রত্যেকটি মাঠে। তবেই, উঠে আসবে ভাল খেলোয়াড়।

তিনি বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি আমাদের তরুণ-যুবদের খেলার সাথে সম্পৃক্ত করতে পারলে সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে তারা মুক্তি পাবে।

হিরক বলেন, ‘ফুটবলে মেধাবী, প্রতিভাবান দেশের যে কোন তরুণকে আমি সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি। তার লেখাপড়া, থাকা-খাওয়া-প্রাকটিস সব খরচ আমার।’

রফিকুল ইসলাম হিরক নব্বই দশকে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। ২০০৫ সালে তিনি আবসন ব্যবসায় নামেন।

রাজধানীতে আবাসন ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত হিরক কথা প্রসঙ্গে জানান, ২০১০ সালে তার চাচা জন্মভূমি যশোরে কিছু করার জন্য বলেন। এরপরই তিনি যশোরে শুরু করেন এই ব্যবসা। তার দেখাদেখি আরও কয়েকটি এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এই শহরে।

তিনি জানান, যশোরে ব্যবসা করতে এসে স্বপ্ন দেখেন যশোরকে সিঙ্গাপুর শহরের মত করে তুলবেন। একটি বিল্ডিং থেকে সরকার ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা রাজস্ব পেয়ে থাকে। আর এই রাজস্ব থেকে যশোর উন্নয়নে ব্যায় করা হয় তাহলে এই শহর সিঙ্গাপুর হতে বেশি দিন লাগবে না বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে কমদামে ফ্লাট বিক্রি হয় যশোরে। অথচ এখানে ফ্লাট করতে ঢাকা থেকে গড় ১৭ শতাংশ বেশি খরচ পড়ে।

তিনি বলেন, ঢাকায় একটি ফ্লাটের রেজিস্ট্রি খরচ যা যশোরে একই। রেজিস্ট্রি খরচ কম করতে পারলে মানুষ ফ্লাট কিনতে আগ্রাহী হবে।

তিনি আরও বলেন, যশোরের বেনাপোল ও শিল্প শহর নওয়াপাড়া থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ের মাত্র পাঁচ শতাংশ বিনিয়োগ করতে হবে। তাহলেই যশোরকে সিঙ্গাপুর বানানো যাবে। আর এ জন্য তিনি তার ‘ব্যবসায় লভ্যাংশের ৯০ শতাংশ যশোরের মানুষের জন্য ব্যয় হবে-এটি ইতিমধ্যে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন। আর সে লক্ষ্যে কাজও করে চলেছেন।’

এস এম রফিকুল ইসলাম হিরক মানুষের পাঁচটি (খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থান) মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানান।

তার মতে, এসব মৌলিক অধিকার প্রথম বাসস্থান। এজন্য তিনি ২০১০ সালে নিজ জেলা যশোর -এ প্রথম আবাসন ব্যবসায় আসেন। প্রথমে আবসন ব্যবসায় নেমে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখিন হতে হয়। এমনকি দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যার জন্য তার গাড়ীতে বোমা হামলা চালায়। তারপর থেমে থাকেননি তিনি। আস্তে আস্তে প্রতিকুল পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠেন। সকল সমস্যা আর প্রতিকুল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে বর্তমানে এগিয়ে চলেছেন তিনি। এখন যশোর শহরের ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন তিনি। এসব প্রকল্পে যশোরের প্রায় ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এখানকার মানুষের জন্য বিনিয়োগ করেছেন কয়েক কোটি টাকা। যার অনেকাংশ যোগান দিয়েছে ইউসিবিএল ব্যাংক, আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেড, ফ্লাট ক্রেতাদের অগ্রিম বুকিংসহ যশোরের মানুষের সহযোগিতায় তার ব্যবসা এগিয়ে চলছে।

তিনি বলেন, ঢাকা মুখি মানুষের যাওয়া বন্ধ করতে হলে মফস্বল শহরকে যুগপোযুগি করে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য মফস্বলে ব্যবসার জন্য ঋণ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে চাকরি বাজার গড়ে তুলতে পারলে মানুষ আর ঢাকায় যাবে না। ঢাকা থেকে ব্যাসায়ীরা মফস্বল মুখি হবে। তাহলে ঢাকার ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

রফিকুল ইসলাম হিরকের যশোর শহরতলীতে একটি মডেল টাউন গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই মডেল শহরের সকল মানুষ নিজের বাড়িতে বাসবাস করবে এমনটাই প্রত্যাশার তার। মডেল টাউনে থাকবে স্কুল-কলেজ. মসজিদ-মাদ্রাসা, হাসপাতালসহ হাট-বাজার, সিনেমা হল। থাকবে বিনোদনের সকল ব্যবস্থা। এই টাউনের মানুষ উন্নত বিশ্বের মত জীবন-যাপন করবে। এই টাউনের মানুষের কোন কিছুর জন্য বাইরে যেতে হবে না। সকল সুযোগ-সুবিধা থাকবে এই টাউনে। এই টাউনের মানুষ নিজস্ব পরিবহনে আসবে শুধু মাত্র ঘুরতে।

আবাসন ব্যবসার কিছু সমস্য তুলে ধরে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আবসন ব্যবসায় ঋণ মাত্র ৬ শতাংশ। আর বাংলাদেশে ঋণের পরিমান ১৮ থেকে ২০ শতাংশ। এসব সমস্যা সমাধান করতে পারলে আরও বেশি মানুষ এ ব্যবসায় আসবে। দেশে বেকারত্বর হার কমবে। অল্প শিক্ষত বেকার যুবকরা এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বেকারত্ব অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারবে বলে তিনি জানান।

তিনি বলেন, ইমারত নির্মাণে সকল কাচামাল (নির্মাণ সামগ্রী) দেশে তৈরি হয়। আবসন ব্যবসায় দেশের অর্থনীতিতে এক তৃতীয়াংশ অর্থ লেনদেন হয়।

মানুষের সুখে-দুঃখে সবসময় এগিয়ে যাওয়া এই মানুষটা রানা প্লাজা ধ্বংসযজ্ঞের সময় তার কর্মীবাহিনী নিয়ে উদ্ধারকাজে ছিলেন। এই ঘটনার বছরপূর্তিতে যশোর অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিক পরিবারকে নগদ টাকা, সেলাই মেসিন, ভ্যান ইত্যাদি সহায়তা দেন। শুধু তাই নয়, বছরপূর্তিতে তিনি যশোরের প্রায় সকল মসজিদে মিলাদ ও দেয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। এ বছরের পহেলা জুলাই যশোর-বেনাপোল রোডে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ান। এমন অনেক সেবামূলক কাজে তার সম্পৃক্ততা শহরের প্রায় সবারই জানা।

এস এম রফিকুল ইসলাম যশোর শহরের ভাষাসৈনিক আফসার আহমেদ সিদ্দিকী সড়কের বাসিন্দা তিনি।

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]