পটিয়ায় জন্মান্ধ চার বোন পৃথিবী না দেখেও মনের আলোয় শিক্ষার দ্যুতি ছড়াচ্ছে!

Patiya pic-01.08.16 (2)সেলিম চৌধুরী, পটিয়া (চট্টগ্রাম) : পটিয়ায় জন্মান্ধ হয়েও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে শিক্ষার দ্যুতি ছড়াচ্ছেন পটিয়ার আজিমপুরের নাছির উদ্দিন চৌধুরীর চার কন্যা যথাক্রমে উম্মে হাবিবা চৌধুরী, উম্মে তাসলিমা চৌধুরী ও উম্মে তানজিলা চৌধুরী এবং বেসরকারী পর্যায়ে উম্মে ছালিমা চৌধুরী। জন্মের পর থেকেই তারা পৃথিবীর আলো দেখেনি। কিন্তু মনের আলোয় পৃথিবী দেখে কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত করার দ্যুতি ছড়াচ্ছেন।

তারা সমাজকে আলোকিত করছেন। এবারের ইত্যাদিতে তাদেরকে নিয়ে ইত্যাদির পরিচালক পটিয়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের এক সময়ের মেধাবী ছাত্র হানিফ সংকেত একটি বিশেষ সচিত্র প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই তৈরি করে ঈদের পরের দিন ইত্যাদি অনুষ্ঠান মালায় দেখানোর ফলে সারা পটিয়ায় আলোচনার কেন্দবিন্দুতে পরিণত হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা চার বোন এক ভাই, ভাই পৃথিবীর আলো দেখলেও চার বোনেই জন্ম থেকেই দৃষ্ঠি প্রতিবন্ধী। বর্তমানে চার জনের মধ্যে তিনজনেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গর্বিত শিক্ষক। অন্য বোন উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে যাচ্ছেন। এখানে আশার কথা হল জন্মান্ধ হলেও থেমে নেই তাদের পথচলা। তারা পটিয়ায় শত শত শিশুর মাঝে ছড়াচ্ছে শিক্ষার আলো। সম্পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এই চার বোনের মধ্যে তিনজন শিক্ষাকতার পাশাপাশি রান্নাবান্না, গান, স্ক্রীন টার্চ মোবাইল ব্যবহার, কম্পিউটার চালানোসহ প্রায় সব কাজে পারদর্শি।

যা বর্তমান সমাজে বিরল এক দৃষ্টান্ত। উম্মে তানজিলা চৌধুরী পটিয়া সদরের মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা, উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা, উম্মে তাসলিমা চৌধুরী পটিয়া সদরের দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা ও অপর বোন উম্মে সালিমা চৌধুরী লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রাইভেট টিউশনি করে জীবন যাপন করছেন।

ভাই নাঈম উদ্দিন আর্ন্তজাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে একটি বায়িং হাউজে কর্মরত রয়েছেন। তাদের জন্মস্থান পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের আজিমপুর গ্রামে। পিতার নাম নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও মাতার নাম শামীমা আক্তার চৌধুরী। তাদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, তারা চট্টগ্রাম শহরের হামজারবাগ এলাকায় বাবার চাকুরির সূত্র ধরে বাসায় বড় হোন।

এসময়কালে চার জনেই মুরাদপুরের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা শেষ করে মাধ্যমিক স্কুল ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করেন। চার বোনের মধ্যে বর্তমানে তাসলিমা, তানজিলা ও হাবিবা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। অন্ধ হয়েও শিক্ষা ক্ষেত্রে অবদান রাখায় উম্মে তানজিলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক চলতি শিক্ষাবর্ষে বছরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের পুরষ্কারে ভূষিত হন।

চার বোনের মধ্যে প্রতিবন্ধী উম্মে তানজিলা চৌধুরী পটিয়া পৌরসভার মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সের এই ছাত্রী লেখাপড়া শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় যোগদান করেন। তানজিলা অন্যান্য শিক্ষকের মত প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে স্কুলে প্রবেশ করে এবং স্কুল ছুটি শেষে বাসায় ফিরে যান। তানজিলার সাথে আলপাকালে তিনি বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরষ্কারে ভূষিত হওয়ায় খুবই কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী আমি জন্মান্ধ হলেও আমার কাজের মূল্যায়ন করায় আমি গর্বিত। তিনি বলেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাজমুন নাহার মেডাম তাকে খুবই ভালবাসেন।

ক্লাস নেওয়ার সময় তাকে প্রতিদিন একজন শিক্ষক সহযোগিতা করে থাকেন। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা নাজমুন নাহার বলেন, তানজিলা গান, কম্পিউটার এবং স্ক্রীন টার্চ মোবাইল অপারেট করতে পারে। সে খুব ভাল শিক্ষক। প্রতিবন্ধীদের উৎসাহ দিলে সমাজকে তারা আরো এগিয়ে নিতে পারবে।

উম্মে হাবিবা চৌধুরী পটিয়া সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা, তিনি নিয়মিত অন্যান্য সুস্থ সবল শিক্ষকের মতই পাঠদান করেন বলে প্রধান শিক্ষিকা চাঁদ সুলতানা বলেন।

ঐ স্কুলেরই পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্রী সাদিয়া বিনতে হাকিম পুষ্পিতা বলেন, আমাদের সুস্থ শিক্ষকদের ন্যায় হাবিবা মেডাম আমাদেরকে সুন্দরভাবে পাঠদান করেন। এবার গত ২ সপ্তাহ পূর্বে আমাদের ক্লাসে হাবিবা মেডামের পাঠদান পর্ব ইত্যাদিতে দেখানোর জন্য রেকর্ডিং করা হয়। যা ইতিমধ্যে প্রচার হয়েছে।

পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা উম্মে তাসলিমা চৌধুরী বলেন, তারা চার বোন অন্ধ হলেও তাদের একমাত্র ভাই (দৃষ্টি শক্তি সম্পন্ন) লেখাপড়া শেষ করে একটি বায়িং হাউসে কর্মরত রয়েছেন। তাসলিমা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন আমি জন্মান্ধ হলেও আমার মনে কোন দুঃখ নেই। আমি আমার হৃদয়ের আয়নায় পৃথিবীকে দেখি।

এ পর্যন্ত নিজের এবং মা বাবা ও ভাইয়ের আন্তরিক সহযোগীতায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহন করতে পেরেছি। সরকার আমাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন করে সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতার সুযোগ দিয়েছেন। আমরা সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ।

নওজোয়ান এর নির্বাহী পরিচালক মোঃ ইমাম হোসেন চৌধুরী বলেন, প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা নই। একই পরিবারের চার বোন জন্মান্ধ এবং তার মধ্যে তিনজন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে যা বর্তমানে এক দৃষ্টান্ত। তিনি (ইমাম হোসেন) দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে কাজ করছেন। এজন্য উপজেলার খানমোহনা এলাকায় একটি নওজোয়ান প্রতিবন্ধী সেন্টার খুলেছেন। এখানে প্রতিবন্ধীদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে থাকেন। প্রতিটি মানুষ প্রতিবন্ধীদের কাজে এগিয়ে এলে তারা সমাজে মাথা উঁচু করে দাড়াতে পারবে। তিনি প্রতিবন্ধীদেরকে অসহায় না ভেবে যে কোন সমস্যায় তার প্রতিবন্ধী সেন্টারে এসে শিক্ষা স্বাস্থ্য সহ যে কোন বিষয়ে সহযোগীতা নেওয়ার আহবান জানান। পটিয়া পৌরসদরের অধিবাসী, স্কুলের অভিভাবক, ক্যাবের নির্বাহী সদস্য সৈয়দ সাজ্জাদ কবির আরজু বলেন এ চার কীর্তিমান শিক্ষিকা অন্ধ হয়েও সমাজে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছে।

আজকের এ ডিজিটাল যুগে যেখানে সুস্থ সবল মানুষ গুলো প্রতিযোগিতায় ঠিকতে পারছে না, সেখানে তাদের এ অর্জন বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে বলে আামি মনে করি। আমি তাদেরকে সরকারি সুযোগ সুবিধা দিয়ে আরো এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

পটিয়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ মোতাহার বিল্লাহ বলেন, শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ গোবিন্দারখীল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মোহছেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যে তিনজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বোন শিক্ষকতা করছেন তারা অন্য সুস্থ শিক্ষকের চেয়ে কোন অংশ কম নয়। বরংচ তারা নিয়মিত স্কুলে আসেন এবং কাজের প্রতি খুবই যত্মবান। তারা কখনো আমাদের কাছে সহানুভূতি চায়নি। নিজের দায়িত্বের প্রতি অবিচল থেকে বেতন ভাতা উত্তোলন করে যাচ্ছে। তারা এখন শুধু অন্ধ নয় স্বাভাবিক মানুষেরও প্রেরনা।

news portal website developers eCommerce Website Design