পলাশে কিশোরী শারমিনের রহস্যজনক মৃত্যু

আল-আমিন মিয়া, নরসিংদী : নরসিংদীর পলাশে কিশোরী শারমিন আক্তারের মৃত্যু রহস্য কাটছেই না। ঘটনার দুই মাস পর থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হলেও নরসিংদী জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, এটি ‘আত্মহত্যা’। হত্যা মামলার পাঁচ আসামিসহ ৬ জনকে রহস্যজনক ভাবে অব্যাহতির আবেদন করে আদালতে চার্জশীট প্রদান করেছেন বলে বাদীর অভিযোগ। আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে চার্জশীটে উল্লেখ করেন ডিবি পুলিশ। কিশোরীর আত্মহত্যার প্ররোচনায় ফাহাদ নামে এক কিশোরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার বাদী ও কিশোরীর বাবা শাহীন মিয়া বলছেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিন করেছেন। এটি আত্মহত্যা নয় পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। এমনকি মামলায় নতুন করে নাম আসা ফাহাদ এ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়।

বাদীর অভিযোগ, হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে চাজর্শীটে পাঁচ আসামিকে খালাসের আবেদন করা হয়েছে। এ কারণে তিনি চার্জশীটের বিরুদ্ধে আদালতে না রাজি দিয়েছেন এবং মামলার পুন:তদন্তের আবেদন করেছেন। হত্যা মামলার আসামিরা হলেন- শাফিন, শওকত ভূইয়া, সজিব, হৃদয় ও উদয়। এদিকে এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া এমদাদুল হাসান টিপুকেও চার্জশীট থেকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

মামলার বাদী শাহীন মিয়া বলেন, মামলার আসামিরা প্রভাবশালী। মামলা তুলে নিতে তারা নানাভাবে আমাকে হুমকি দিচ্ছে। তারা মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করেছে। আসামিরা শারমিনকে বিভিন্ন সময় ভয় দেখিয়ে ছিনতাই কাজে ব্যবহার করেছে। পরে সে এই কাজে রাজি না হওয়ায় হত্যা করে। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা আত্মহত্যা বলে চার্জশীটে উল্লেখ করেছেন। আত্মত্যার প্ররোচনায় ফাহাদকে দায়ী করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে ফাহাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।  এ বিষয়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি সাইদুর রহমান বলেন, এটাতো আর লুকোচুরির বিষয় না।  তদন্তে যা পাওয়া গেছে তার ভিত্তিতেই চাজর্শীট দেয়া হয়েছে। বাদীর আপত্তি থাকলে তিনি আদালতে না রাজি দিতে পারেন। মামলার তদন্ত প্রভাবিত করা হয়েছে এমন অভিযোগও সঠিক নয়।

অপমৃত্যু মামলা থেকে হত্যা মামলা: পলাশ থানা পুলিশ জানায়, গত ১০ জুলাই শারমিনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় প্রথমে একটি অপমৃত্যু মামলা হয়। এর দুই মাস পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর শারমিনের বাবা শাহীন মিয়া একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।  এ বিষয়ে পলাশ থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর হত্যা মামলা নেয়া হয়। এদিকে আদালতে দেয়া চার্জশীটেও উল্লেখ করা হয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এটি একটি হত্যাকান্ড বলে প্রমাণিত হওয়ায় এজাহার দাখিল করলে পলাশ থানার ওসি মামলাটি রুজু করেন।

হত্যা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামি শাফিন, শওকত র্ভূইয়া, সজীব, হƒদয় ও উদয়সহ অজ্ঞাত আরো কয়েকজন শারমিনকে উত্যক্ত করতো। শাহীন এবং তার স্ত্রী আসামিদের কাছে গিয়ে উত্যক্ত না করার অনুরোধ করতেন। কিন্তু আসামিরা প্রায়ই ভয় দেখাতো। এক পর্যায়ে তারা শারমিনকে ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে ফোন করে ভূইয়ার ঘাট এলাকায় আনার কথা বলতো। শারমিন মোবাইল ফোনে অজ্ঞাত ছেলেদের ডেকে নির্জন এলাকায় নিয়ে আসতো। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিতো আসামিরা। পরে এগুলো ফেরত দিতো টাকার বিনিময়ে। গত বছরের ১ জুলাই আসামিরা শারমিনকে নিয়ে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভূইয়ার ঘাটে যায়। আসামিদের কথা মতো অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কাছ থেকে বাই-সাইকেল ও টাকা পয়সা হাতিয়ে নেয়। শারমিন বাসায় চলে যেতে চাইলে আসামিরা তাকে মারধর করে।

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শারমিনকে বাসায় না পেয়ে তাকে খুঁজতে থাকে পরিবারের সদস্যরা। পরে তারা বিষয়টি বুঝতে পেরে সজীবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে। আইনের ভয় দেখালে শারমিনকে বাসার সামনে রেখে যায় আসামিরা। পরিবারের সদস্যরা তাকে অচেতন অবস্থায় পায়। সুস্থ্য হলে সে পুরো ঘটনা জানায়। তখন লজ্জায় বিষয়টি কাউকে জানানো হয়নি। পরে ৭ জুলাই শারমিনকে গাজীপুরে নিয়ে যান তার বাবা শাহীন। পরদিন সে আবারো দক্ষিণ পলাশে চলে আসে। সেখানে আসার পর আসামিরা আবারো শারমিনকে নানাভাবে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অজ্ঞাত ছেলেদের মোবাইল ফোনে ডেকে আনতে বলে। এতে সে রাজি না হওয়ায় এলাকা ছাড়ার হুমকি দেয় আসামিরা। সমাজের কাছে হেয় করার হুমকিও দেয়া হয় তাকে। পরে ৯ জুলাই রাত ৯টা থেকে ১০ জুলাই ভোর ৪টার মধ্যে যেকোনো সময় শারমিনকে আসামিরা সুকৌশলে ডেকে এনে পরিকল্পিতভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। হত্যার পর বসত ঘরের দক্ষিণ পূর্ব কোণে একটি সুপারি গাছের ওপর হেলে পড়া অপর একটি সুপারি গাছের মাঝখানে গলায় ওড়না পেচিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখে। এজাহারে শাহীন আরও বলেন, মান-সম্মানের কথা চিন্তা করে আমার স্ত্রী তখন অপমৃত্যু মামলা করে। পরে শারমিনের মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত জেনে থানায় অভিযোগ দায়ের করি।

নিরীহ কিশোরকে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ : খোদ মামলার বাদী বলছে, আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাদে নাম আসা কিশোর ফাহাদ ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত নয়। তাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে। হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে এবং মামলার আসামিদের বাদ দিতে প্রভাবিত হয়ে এই তদন্ত করেছে। চার্জশীটে উল্লেখ করা হয়েছে, শারমিন প্রফেসর ফজলুল হক টেক্সটাইল মিলে চাকুরী করতো। ওই সময় ফাহাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফাহাদ কখনো কখনো শারমিনের বাসায় আসা-যাওয়া করতো, বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে বের হতো। ফাহাদ হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। অনেক কষ্টে ফাহাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শারমিন। কিন্তু ফাহাদ সম্পর্ক রাখতে চায় না এবং তাকে ভুলে যেতে বলে। শারমিন ব্যক্তিগত ডায়েরিতে এসব লিপিবদ্ধ করেছে। তার অভিভাবকরা তাকে শাসন করে। এ কারণে শারমিন রাগে, দু:খে ও অভিমানে আত্মহত্যা করে।

জেলা ডিবি পুলিশের এসআই ও হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুল গাফফার এজহারনামীয় পাঁচ আসামী এবং পরে নাম আসা এমদাদুল হাসান টিপু ঘটনার সঙ্গে জড়িত এমন কোনো প্রত্যক্ষ, নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য প্রমাণ তদন্তকালে পাননি বলে চার্জশীটে উল্লেখ করেন। নিরীহ কিশোরকে ফাসিয়ে দেয়া হয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির ওসি সাইদুর রহমান বলেন, এ ধরণের অভিযোগ ঠিক নয়।

news portal website developers eCommerce Website Design