শনির দশায় পতিত হলো সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের শনির হাওর

আল-হেলাল, সুনামগঞ্জ : একাধারে ২৫ দিন নির্ঘুম রাত পার করে পালাক্রমে স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজ করেও শেষ রক্ষা হলো না শনির হাওরের লালুয়ার গোয়ালা বাঁধটির। সহজ কথায় বলতে গেলে শনির দশায় পতিত হয়েছি জেলার বৃহত্তম এ হাওরটি।

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ওই বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ হাওরপাড়ের কৃষকরা। শনিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকেই লালুয়ার গোয়ালা বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। তবুও শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান হাজারো কৃষক। রাতভর প্রাণপণ চেষ্টায় আশার আলো শেষ পর্যন্ত নিভেই গেল, তলিয়ে গেল হাওরের ১৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল। জানা যায়, সুনামগঞ্জের সবকটি হাওর তলিয়ে গেলেও তাহিরপুর উপজেলার সর্ববৃহৎ এই হাওরটি কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমে এতোদিন টিকেছিল।

বোরো ধানে সমৃদ্ধ বৃহত্তর এ হাওরে তাহিরপুর উপজেলার সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর ও পাশ্ব ভর্তি জামালগঞ্জ উপজেলার ৩ হাজার হেক্টরের অধিক জমিতে কৃষকরা বোরো ধানের চাষাবাদ করেছে। বাকী জমিগুলো হচ্ছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার। হাওর ডুবায় হতাশায় ভেঙ্গে গেছে সবার মন কারন এই বাঁধ ভাঙ্গার ফলে শনির হাওর রক্ষার আর কোন উপায় থাকল না। খবর পেয়ে বাঁধে ছুঠে যান তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সহ হাওর পাড়ের কৃষকগন। নিমিষেই হাওর যেন কানায় কানায় পূর্ন হয়ে উঠছে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলের পানিতে। হাওরপাড়ের বাদল,সাইদুল,নাসরুম,সোহাগ,সাদেক আলী সহ স্থানীয় কৃষকরা জানান,যেভাবে হাওরে পানি ডুকছে রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে শনির হাওরের আধা পাকা ও কাচাঁ বোরো ধান পানির নিচে ডুবে যাবে। তাই এখন কাঁচা ধানই কাটছি এছাড়াতো আর কিছু করার নাই। তারা আরো অভিযোগ করে বলেন,গত ২৮শে ফেব্রুয়ারীর মধ্যে এই উপজেলার ২৩টি হাওরের ১৮টি বেরী বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষ করার সরকারি নির্দেশ থাকলেও ৪০ভাগ কাজও শেষ করে নি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার ও পিআইসিগন।

নিজেদের খেয়াল খুশি মত,দায় সারাভাবে বাঁধ নির্মান করায় একের পর এক হাওর ডুবে এ উপজেলার ৯০ ভাগ বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। বাঁধ রক্ষায় ফাঠল ও দেবে যাওয়া অংশে সংস্কারের কাজ করেছে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল সহ হাওর পাড়ের কৃষকগন দিন-রাত স্বেচ্ছাশ্রমে। আর এই ফসল ফলাতে কৃষকরা এনজিও,ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ছড়া সুদে ঋন নেওয়ায় এখন ফসল হানির কারনে পরিশোধ নিয়ে হতাশায় দিন পার করছে হাওর পাড়ের কৃষকরা। হাওরপাড়ের মধ্য তাহিরপুর গ্রামের খেলু মিয়া বলেন, ১০ কিয়ার (৩০ শতাংশে এক কিয়ার) জমি রোপন করেছিলাম। এক টুকরো ধানও কাটতে পারিনি। পরিবার-পরিজন নিয়ে এখন কিভাবে বাঁচবো ভেবে পাচ্ছি না। উজান তাহিরপুর গ্রামের আবুল কালাম বলেন, দুই হাল জমি চাষ করেছিলাম। অনেক আগেই বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড সদস্য মধ্য তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা মতিউর রহমান মতি বলেন, এক হাল জমি চাষ করেছিলাম। এক কিয়ারের মতো খেতের ধান কাটা হয়েছে। বাকি সব তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়-তাহিরপুর উপজেলার এ বছর উপজেলায় ১৮ হাজার ৩ শত  হেক্টর জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান চাষবাদ করা হয়েছে।

শনির হাওর ডুবে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার হেক্টর কাঁচা,আধা পাকা বোরো জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানিতে তলিয়ে যাওয়া হাওরের কাচাঁ ও পাশ্বভর্তি জামালগঞ্জ উপজেলার ৩ হাজার হেক্টর বেশি আধা পাকা ধান কাটছে এখন কৃষকগন। উপজেলার ছোট বড় ২৩ টি হাওরে উৎপাদিত ২শ কোটি টাকার ফসলের উপর নির্ভর করেই জীবন জীবিকা চলে হাজার হাজার কৃষক পরিবারের। এবছর ৯০ ভাগ বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

তাহিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম জানান-রাত সাড়ে ১২টায় খবর আসে শনির হাওরের লালু গোয়ালা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ফলে সাড়ে ৯ হাজার হেক্টরের বোরো জমির আধা কাচা-পাকা ধান বেশির ভাগ পানিতে ডুবে যাচ্ছে। এ বছর হাওরের ক্ষতির পরিমান অন্যান্য বছরের চেয়ে অনেক বেশি। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন-সঠিক ভাবে বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে একের পর এক হাওর ডুবছে। শনির হাওরের বাঁধটি রক্ষায় আমি সহ হাজার হাজার কৃষক সবাই ২৫দিন ধরে অবস্থান করছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাঁধটির শেষ রক্ষা করতে পারলাম না।

লালুরগোয়লা বাঁধ ভেঙ্গে ও সাহেব নগর আপর দিয়ে পাহাড়ী ঢলের পানি এখন শনির হাওরে তীব্রগতিতে ডুকছে। এবার কৃষকের কষ্টের শেষ নেই। বাঁধ নির্মানে দূর্নীতিবাজদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবী ও কৃষকের সহযোগীতার দাবী জানাই। তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইুসলাম জানান-শনির হাওরের বাঁধ রক্ষায় চেষ্টা করে যাচ্ছিলো হাজার হাজার কৃষক শ্রমিক। কিন্তু গত শনিবার দিনগত মধ্য রাতে খবর পেলাম যে লালুরগোয়ালা বাঁধ ভেঙ্গে গেছে যার ফলে শনি হাওর রক্ষা করা সম্ভব হল না।

এর আগে অকাল বন্যায় ধান পচে সৃষ্ট গ্যাসে সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে ৫০ মেট্রিক টন মাছ মরে গেছে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সৈয়দ মেহেদী হাসান। জেলার মাটিয়ান হাওর,শনির হাওর, করচার হাওর ও বিশ্ব ঐতিহ্য টাঙ্গুয়ার হাওর পরিদর্শন শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় সার্কিট হাউজে গণমাধ্যমকর্মীদের এ তথ্য দেন তিনি। প্রসঙ্গত, চলতি মৌসুমে ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ও কোথাও কোথাও বাঁধ না হওয়ায় একের পর এক হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার লাখ লাখ বোরো চাষি সর্বশান্ত হয়ে যায়। জেলাজুড়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, কৃষক সংগঠন ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানান।