হাওরে খাবারের জন্য হাহাকার

ওয়ান নিউজ, সুনামগঞ্জ : ‘সকালে চুলা জ্বলেনি। স্কুল বাদ দিয়ে চলে এসেছি খোলা বাজারের চাল কিনতে। গতকালও এসেছিলাম। তালিকায় নাম নেই বলে চাল কিনতে পারিনি। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে না খেয়ে অাছে। যে টাকা অাছে, তা দিয়ে বাজার থেকে চাল নিলে কাল অাবারও না খেয়ে থাকতে হবে। অাজও চাল নিতে পারলাম না। কোনাে উপায় দেখছি না।’

চোখে পানি। ক্ষুধার ছাপ চোখে-মুখেও লেগে অাছে। হাফ শার্ট অার লুঙ্গি পরা অাব্দুর রশিদ মাটিয়ানা হাওরের বাসিন্দা। তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়ধল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। নৌকায় সকালে গিয়েছিলেন তাহিরপুর বাজারে। খোলাবাজারে ১৫ টাকা দরের চাল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন প্রায় অাড়াই ঘণ্টা। তালিকায় নাম নেই বলে লাইন থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে।

এই প্রতিবেদককে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসেন অসহায় মধ্যবয়সী অাব্দুর রশিদ। অাড়ালে ডেকে নালিশও করলেন। বললেন, সব চাল-অাটা তাহিরপুর বাজারের অাশপাশের মানুষরাই পাচ্ছেন। খোলাবাজারে এখানে মাত্র দুশ জন মানুষের কাছে চাল-অাটা বিক্রি করা হচ্ছে। অামরা যারা একেবারে দুর্গত এলাকা থেকে এসেছি, তারা নাগালেই যেতে পারছি না। ১১ বিঘা জমির ধান পানির নিচে। অার এখন চালের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছি।

চোখ মুছতে মুছতেই অাব্দুর রশিদের কণ্ঠ ধরে এলো। শার্টের পেছনে গুঁজে রাখা চালের খালি ব্যাগটি দেখিয়েই কথা বন্ধ করে দিলেন। যেন রাষ্ট্র-সমাজের প্রতি অভিমান করেই কথা বন্ধ করে দেয়া।

পাশেই অারেক ক্ষতিগ্রস্ত সোহেল মিয়া। মাটিয়ানা হাওর থেকেই এসেছেন। তিনিও ক্ষোভের কথা শোনালেন। বললেন, ‘সরকার অনেক ত্রাণের কথা বলছে। কিছুই তো পাচ্ছি না অামরা। লাইনে দাঁড়িয়ে খোলাবাজারের চাল কিনব, তাও মিলছে না।’

তাহিরপুর বাজারের খোলাবাজারের চাল-অাটার ডিলার জগদীশ রায়। বলেন, ‘হাওরে পানি অাসার পর থেকে প্রতিদিন দুশ জনের কাছে ১৫ টাকা দরে ৫ কেজি চাল এবং ১৭ টাকা দরে ৫ কেজি করে অাটা বিক্রি করছি। দিনে দিনে চাপ বাড়ছে। আজ চারশ জনকে দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু লাইনে দাঁড়ানো অর্ধেক মানুষের কাছেও চাল-অাটা বিক্রি করতে পারব না। ক্ষুধার জ্বালায় মানুষ হাহাকার করছে। বেসামাল হয়ে পড়ছি। পুলিশ দিয়েও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছি না।’

লাইনে দাঁড়িয়েই কথা বলেন বৃদ্ধ সোলায়মান শেখ। বলেন, টাকা ধার করে এনে ৫ কেজি চালের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অাছি। দুপুর গড়ালো। এখনও ডাক পড়ল না। রোদে অার দাঁড়াতে পারছি না। অথচ জমিতে মণকে মণ ধান পানির নিচে পচে গেল।

সরকার যে ত্রাণ দিচ্ছে তা অপ্রতুল বলে মত দিলেন তাহিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুলও। বলেন, সরকার মাসে ৩০ কেজি চাল এবং ৫০০ টাকা করে ত্রাণ দেয়ার ব্যবস্থা করছে পরিবারপ্রতি। এটি কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। যে পরিবারে পাঁচজন সদস্য সেই পরিবারের জন্য এক কেজি চাল খুবই কম। ধান আর মাছ-ই তো হাওরবাসীর বেঁচে থাকার পাথেয়। ধান পচে গেল, মাছও মরে গেল। অন্য কোনো উপায় নেই এ অঞ্চলের মানুষের কাছে। অন্য অঞ্চলের বন্যার সঙ্গে তুলনা করে এখানে ত্রাণের ব্যবস্থা করলে ভুল হবে। এখানকার মানুষদের বাঁচাতে হলে এখনই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।