ড্রাগন চাষে ভাগ্য বদলালেন চৌগাছার ঈসমাইল

dragon fruit

চৌগাছা থেকে ফিরে হাসান মাহমুদ:

“সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা
দেশ মাতারই মুক্তিকামী দেশের সে যে আশা।”
dragon fruit

 

কবির সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চায়, সব সাধকের চেয়ে বড় সাধক হলেন আমার দেশের চাষী। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যে কৃষক শরীরের ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করেন সোনার ফসল। পুরো জাতি তাকিয়ে থাকে ওই চাষীর দিকে, যে চাষীর কারণে অর্থনৈতিক মুক্তি আসে নিজের, পরিবারের এবং সমাজের। ফলে বদলে যায় একটি জনপদ, উৎসাহিত হয় আশেপাশের অগণিত মানুষ। এমনই একজন চাষীর নাম এনামুল হোসেন ওরফে ঈসমাইল। যিনি শাক-সবজি চাষাবাদের পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন ড্রাগন ফলের বাগান। এই ফল দিয়ে নিজের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি পরিবারেও এনেছেন সুখের হাসি।

ড্রাগন ফল‘জীবনে শখ ছিল ব্যতিক্রম কিছু করার। তাই পড়ালেখা শেষ ২০০৮ সালে চাকরি নিই একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে। ২০১৩ সালের কোনো একদিন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে একটি সড়ক দূর্ঘটনায় আমার একটি পা ভেঙে যায়। এতে আমি দীর্ঘদিন বিছানায় পড়ে থাকি। সুস্থ হয়ে থাই পেয়ারা, আপেল ও বাউকুলের বাগান করি। এসবের মধ্যেই আমার মাথায় চিন্তা আসে সবাই তো পেয়ারা আর কুলের বাগান করছে। আমি না হয় নতুন কিছু একটা করি। যা দেখে মানুষ অনুপ্রাণিত হবে।’ এভাবেই নিজের স্বপ্নের কথাগুলো বলছিলেন যশোরের চৌগাছা উপজেলার সরুপদাহ ইউনিয়ানের ভারত সীমান্ত লাগোয়া তিলেবপুর গ্রামের এই চাষী।

২০১৫ সালে লাভজনক বিদেশি এই ড্রাগন ফল দুই বিঘা জমিতে চাষের মধ্য দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ শুরু করেন যুবক ঈসমাইল। ঢাকার বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় বর্তমানে তার ড্রাগন বাগান ৯ বিঘা। এছাড়া তার দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নতুন করে চাষ শুরু করেছেন আমীর আলী, তরিকুল ইসলামসহ অনেকে।

কিভাবে এই ড্রাগন ফলের সন্ধান পেলেন? জানতে চাইলে ঈসমাইল বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমার নতুনের দিকে ঝোক ছিল। সব সময় মনে হতো নতুন কিছু করি। যখন অসুস্থ ছিলাম তখন নিজের স্মার্টফোনে ইন্টারনেটে সার্চ দিতে থাকলাম। সেখানে প্রথম ড্রাগন ফল ও এর চাষাপদ্ধতি সম্পর্কে জানলাম। কিন্তু এর চারা বা গাছ কোথায় পাওয়া যাবে সে সন্ধান পাচ্ছিলাম না। হটাৎ একদিন শুনি আমার বাড়ির কাছের হিজলী গ্রামের জুলফিকার নামের একজন তার নার্সারীতে চারা করেছেন। তখন থেকেই আমি এর পেছনে লেগে থাকি।

এই সূত্র ধরে বন উন্নয়ন নার্সারী এন্ড অর্গানিক ফার্ম এর মালিক মো: জুলফিকার সিদ্দিক এর কাছে ড্রাগন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ড্রাগন ফলের খবর পাই ২০০৮ সালে। ওই সময় ময়মনসিংহ কৃষি  বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২৪০ টাকা টাকা দরে আমি দুটি ড্রাগনের চারা কিনে নিয়ে আসি। রোপনের পর একটি চারা মারা যায় আর একটি চারা বেঁচে থাকে। পরবর্তীতে সেটা থেকেই আস্তে আস্তে কলম করে আমি নার্সারী করি। ২০১৪ সাল থেকে আমি ড্রাগনের চারা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছি।

ঈসমাইল জানায়, ২০১৫ সালের এপ্রিল পিচ প্রতি ৬০ টাকা দরে ১৭০০টি  ড্রাগনের চারা কিনে নিজস্ব প্রযুক্তিতে আমি দুই বিঘা জমিতে রোপন করি। প্রথম বছর সব মিলিয়ে খরচ হয় ৪ লাখ টাকা। দ্বিতীয় বছরে জমিতে সার, পানি ও পরিচর্যা বাবদ খরচ হয় ৮০ হাজার টাকা। এ বছর (২০১৭) প্রথম ফল হয়েছে। ফুল থেকে ফল পরিপক্ক হতে ২০ থেকে ৩৫ দিন সময় লাগে। মে-জুন থেকে শুরু হয়ে অক্টবর-নভেম্বর পর্যন্ত এরা ফল দেয়। অর্থাৎ গরম ও বর্ষাকাল হচ্ছে এর মৌসুম। তবে নতুন হওয়ায় এ বছর উৎপাদন কম হয়েছে। তছাড়া বুঝতেও কিছুটা সময় লেগেছে।
এ বছর প্রথম থেকেই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা দরে ফল বিক্রি করছি। ফলের মান ভালো হলে কেজিতে ৪-৫ টি ফল হয়। ফল কোথায় বেঁচেন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা যেমন- আগুরা, কাওরন বাজার, গুলশান, বনানী, উত্তরাসহ বড় বড় বাজারে এ ফলের ব্যপক চাহিদা থাকায় প্রথমে ক্রেতার এখানে কিনতে আসতো। পরে তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে উঠায় এখন আমি পরিপক্ক ফলগুলো সংগ্রহ করে মাবাইলে যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকায় পঠিয়ে দিই এবং তারা বিকাশের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে দেয়। তাছাড়া বর্তমানে স্থানীয় বাজারেও বিক্রি হচ্ছে এটি। সপ্তাহে চৌগাছা বাজারে তার ১০-১২ কেজি বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রথম বছরে মাচা পদ্ধতিতে চাষ করেছিলাম। কিন্তু ফল আশা অনুযায়ী না পওয়ায় এবার সেটা ভেঙে খুঁটি দিয়েছি। চলতি বছর জমিতে খরচ হয়েছে ১ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত বিক্রি করেছি ৪ লাখ টাকার মত ড্রাগন। বাগানে আছে আরো ২ লাখ টাকার ড্রাগন। দুই বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ করে সফল হওয়ায় তিনি এ বছর নিজে চার কলম করে আরও সাত বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ করেছেন। নতুন বাগানে আগামী বছর ফল আসবে বলে আশাবাদী এ উদ্যমী মানুষটি।
ঈসমাইল জানান, তিন বছরের অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে বিঘাপ্রতি বছরে ৫০ হাজার টাকা খরচ করতে পারলে ৫-৬ লাখ টাকার ড্রাগন বিক্রি করা যাবে। তার দাবি, দেশের অন্যান্য ড্রাগন চাষিদের থেকে তার চাষাবাদের পদ্ধতি অনেকটা ব্যতিক্রম।

এ বিষয়ে চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম শাহাবুদ্দীন আহমেদ বলেন, দেশে অপ্রচলিত একটি ফল ড্রাগন। ড্রাগন দেখতে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো। এর গাছ দেখে সবাই একে ‘সবুজ ক্যাকটাস’ বলেই মনে করেন। কার্টিং লাগাতে হয় অক্টোবর মাসে। দেড় থেকে দুই বছরের মাথায় মে-জুন থেকে শুরু হয়ে অক্টবর-নভেম্বর পর্যন্ত গাছের ফল বিক্রি শুরু করা যায়। একবার লাগিয়ে সঠিক পরিচর্যা করলে একটানা ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দেয় একটি ড্রাগনগাছ। মধ্য আমেরিকায় এ ফল বেশি পাওয়া যায়। ড্রাগন ফল দেখতেও খুব আকর্ষণীয়। আমেরিকাসহ এশিয়া মহাদেশের অনেক দেশে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ড্রাগন ফলে ক্যালোরি খুব কম থাকায় এ ফল ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য ভালো। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি ও আয়রন রয়েছে। যে কারণে শরীরের চর্বি ও রক্তের কোলেস্টেরল কমানোসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে এ ফলটি। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটেসহ বড় বড় শহরের চেইন শপে ড্রাগন ফল বিক্রি হচ্ছে।

এ সময় তিনি জানান, এই এলাকার (চৌগাছা) মাটি ড্রাগন ফল চাষাবাদের জন্য বেশ উপযোগী। তাছাড়া দেশে এর চাহিদা ও দাম ভালো হওয়ার কারণে কৃষকদের ড্রাগন চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।

news portal website developers eCommerce Website Design