দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে হেলিকপ্টার সার্ভিস

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে হেলিকপ্টার সার্ভিস। বিশেষ করে বিদেশী পর্যটকদের কাছে হেলিকপ্টারে ভ্রমণ দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। দেশের বড় বড় শিল্পপতি, ব্যবসায়ী এবং ভিআইপিরা জরুরী মিটিং, ভ্রমণ, বিবাহ অনুষ্ঠানে দ্রুত যাতায়াতের জন্য প্রাইভেট হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। এটি এখন ভিআইপদের আভিজাত্যের প্রতীক। অনেক পরিবারেই বিবাহ অনুষ্ঠানে বর কনের চলাচলের জন্যও হেলিকপ্টার ব্যবহার করছেন।

এছাড়া রোগী আনা-নেয়াসহ আরও অনেক কারণে প্রাইভেট হেলিকপ্টার ব্যবহার বাড়েছে। তারা কম সময়ে দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্থান ঘুরে বেড়ানোসহ সময় বাঁচাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। গত ৫ বছরে প্রাইভেট হেলিকপ্টারে ব্যবসাও কয়েকগুণ বেড়েছে। দেশের সড়ক পথের বেহাল দশা এবং সময় বাঁচাতে হেলিকপ্টারের চাহিদা বেড়েছে। সিভিল এভিয়েশন এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তবে সবক’টি বেসরকারী হেলিকপ্টার কোম্পানী তাদের হেলিকপ্টারগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকেই ব্যবহার করে আসছেন। প্রাইভেট হেলিকপ্টার সার্ভিসের পাওয়ার জন্য এ বন্দরের সংশ্লিষ্ট সংস্থায় এবং অনলাইনে যোগাযোগ করে সেবা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।

সিভিল এভিয়েশনের পরিচালক ইউং কমান্ডার চৌধুরী জিয়াউল কবীর বলেন, বর্তমানে দেশে ৯টি কোম্পানির ১৫টি হেলিকপ্টার রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী। দেশে এ ৯টি প্রতিষ্ঠান হেলিকপ্টার ভাড়া দিয়ে থাকে। এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দ্রুত এবং জরুরী প্রয়োজনে দেশের শিল্পপতি এবং নামী দামী ব্যসায়ীরা এখন হেলিকপ্টার বেশি ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, এখন চাহিদা বেড়েছে, সেইসাথে এ খাতে ব্যবসাও বেড়েছে।

গণমাধ্যমের জরুরি সংবাদ সংগ্রহ, নাটক কিংবা সিনেমার শুটিং, রাজনৈতিক নেতাদের সফর, বিবাহ অনুষ্ঠানে বরযাত্রী, এবং ভিআইপি ব্যবসায়ীরাও এখন হেলিকপ্টারের ব্যবহার করছেন। হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তাদের যাত্রীর একটি বড় অংশই এ দেশে আসা তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা।

কারণ যানজটের জন্য সড়কপথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা একটু দূরের কোনো শহরে যেতে এখন অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ঢাকা থেকে কুমিল্লা যেতেই অনেক সময় ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা লাগে। আবার অনেক এলাকায় সড়কের বেহালদশা। আবার কোন কোন স্থানের রাস্তা-ঘাটের অবস্থাও খুব খারাপ। ফলে একজন বিদেশী এসব খারাপ সড়ক যোগাযোগ এড়িয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে আগ্রহী এবং তারা তাই করেন।

সিভিল এভিয়েশনের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগ জানায়, দেশের আকাশ পথে হেলিকপ্টার ব্যবহারে সরকারের নীতিমালা ভিত্তিতে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। একটি এয়ারলাইন্স সংস্থার লাইসেন্স পেতে যা যা দরকার হেলিকপ্টারের লাইসেন্স পেতে একই নিয়ম-কানুন। এনওসি, হেলিকপ্টার ইন্সপেকশন, অফিস ইন্সপেকশন, পাইলট, ক্রু লাইসেন্স ভেরিফিকেশন, ম্যানেজমেন্টের সক্ষমতা সবকিছু যাচাই-বাছাই করার পর এয়ার ওয়ার্দিনেস সার্টিফিকেট (এওসি) দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সুত্র জানায়, বাংলাদেশে সর্বপ্রথম সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স নামে একটি কোম্পানি বাণিজ্যিক লাইসেন্স নিয়ে এই ব্যবসা শুরু করে। বর্তমানে সিকদার গ্রুপের ৩টি হেলিকপ্টার রয়েছে। হেলিকপ্টারগুলো হলো, বেল-৪০৪, আর-৬৬ ও আর-৪৪। সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স ৩টি হেলিকপ্টার মধ্যে ২টি আর-৪৪, ১টি আর-৬৬। স্কয়ার গ্রুপের ১টি, পিএইচপি গ্রুপের ১টি, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এর ১টি, বি আরবি ক্যাবল কোম্পানীর ১টি, মেঘনা গ্রুপের ১টি, ইয়াং ইয়াং (আরিয়ান) গ্রুপের ২টি, এমএস বাংলাদেশ ১টি। সবারই আবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিশাল হ্যাংগারও রয়েছে।

স্কয়ার এয়ারলাইন্সের হেলিকপ্টারগুলো সাধারণ কাজের জন্য ভাড়া প্রতি ঘণ্টার জন্য ১ লাখ টাকা, আর ১৫ শতাংশ ট্যাক্স। কিন্তু এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের জন্য প্রতি ঘণ্টায় ৯০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়, সঙ্গে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স। এছাড়া ভূমিতে অপেক্ষমাণ চার্জ প্রতি ঘণ্টার জন্য ৬ হাজার টাকা, সঙ্গে ১৫ শতাংশ ট্যাক্স।

সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স সাধারণ কাজের জন্য হেলিকপ্টার ভাড়া প্রতি ঘণ্টার জন্য ৫৫ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু সিনেমার শুটিং, লিফলেট বিতরণসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজের জন্য ভাড়া ৩০ শতাংশ বেশি। এছাড়া ভূমিতে অপেক্ষমাণ চার্জ প্রথম ঘণ্টার জন্য ৩ হাজার টাকা এবং পরবর্তী প্রতি ঘণ্টার জন্য ৫ হাজার টাকা। তবে বিমানবন্দর ছাড়া অন্য কোন স্থানে হেলিকপ্টার অবতরণ করতে হলে হেলিকপ্টারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যিনি ভাড়া নেবেন তার। এছাড়া পুরো খরচের ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয়। এই কোম্পানি থেকে ন্যূনতম ৩০ মিনিটের জন্য হেলিকপ্টার ভাড়া দেয়া হয়। জ্বালানি খরচ, ইন্স্যুরেন্সসহ বাকি সব কিছু কোম্পানিই বহন করে।

সিকদার গ্রুপের আর অ্যান্ড আর এয়ার লাইনসের সাত সিটের হেলিকপ্টার ভাড়া ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সঙ্গে ভ্যাট ১৫ শতাংশ। তিন সিটের ভাড়া ঘণ্টায় ৭২ হাজার টাকা। এক ঘণ্টা অবস্থান করলে দিতে হবে ৭ হাজার টাকা।

সিভিল এভিয়েশন জানায়, গত ৫ বছর আগেও দেশে বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার ভাড়া দেওয়ার কাজ করত মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান। তবে চাহিদা বাড়াতে এখন বেসরকারিভাবে হেলিকপ্টার কোম্পানী এবং ব্যবসাও বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, স্কয়ার এয়ার লিমিটেড, সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স, মেঘনা এভিয়েশন, আরঅ্যান্ডআর এভিয়েশন (সিকদার গ্রুপের), ইমপ্রেস এভিয়েশন, বাংলা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস এবং বিআরবি এয়ার লিমিটেড, বসুন্ধরা এয়ারলাইন্স। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় বর্তমানে হেলিকপ্টার আছে ১৫টি। পাঁচ বছর আগে তাদের সম্বল ছিল মাত্র পাঁচটি হেলিকপ্টার।

কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের যেকোনো স্থানে হেলিকপ্টারে ভ্রমণের জন্য প্রতি ঘণ্টায় (ফ্লাইং আওয়ার) ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ পড়ে। কোথাও যাত্রাবিরতি (গ্রাউন্ড ওয়েটিং) করলে প্রতি ঘণ্টায় মাশুল দিতে হয় ৬ থেকে ৯ হাজার টাকা। এসব মাশুলের সঙ্গে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন করও (মূসক) আরোপ করা হয়।

একটি হেলিকপ্টার সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, দেশের অভ্যন্তরে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ব্যবসা ও কলকারখানার সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এসব শিল্পগোষ্ঠীর মালিকেরা তাঁদের মালিকানাধীন শিল্পগুলো দেখভাল করার জন্য ও জরুরি ব্যবসায়িক প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন।

স্কয়ার হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, স্কয়ার হাসপাতালের মুমূর্ষু রোগীদের আনার জন্যই ২০১০ সালে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে হেলিকপ্টার সার্ভিসটির চালু করা হয়। এছাড়া দেশের যেকোনো স্থানে যাত্রী পরিবহন করতেও হেলিকপ্টার সার্ভিস বা সেবা প্রদান করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি স্কয়ার গ্রুপের বিভিন্ন ব্যবসায়ীক প্রয়োজনে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি তেল, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, পাইলটসহ কারিগরি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বেতনসহ মাসে একটি হেলিকপ্টারের পেছনে অন্তত ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি হেলিকপ্টার রাখার জন্যও (হ্যাঙ্গার) অনেক বড় জায়গা ব্যবহার করতে হয় এবং এ খাতেও ব্যয় করতে হয়।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে দেশে বেসরকারি উদ্যোগে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে হেলিকপ্টার সেবা চালু করে সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস।

স্কয়ার এয়ার লিমিটেড
স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের যে হেলিকপ্টার আছে তাতে এক সাথে ৬ জন যাত্রী বহন করা সম্ভব। এই হেলিকপ্টারের নাম বেল-৪০৭, এতে ভ্রমণ ঘন্টায় গুণতে হবে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া স্কয়ার এয়ার লিমিটেডের ৪ জন বহনে সক্ষম রবিনসন আর-৬৬ এর ভাড়া কিছুটা কম এটা ৭৫ হাজার প্রতি ঘন্টা। প্রতি ঘন্টায় ভূমিতে অপেক্ষার জন্য ৬ হাজার টাকা আর ভূমি থেকে উড্ডয়নের পর প্রতি ঘন্টায় আপনাকে দিতে হবে ২ হাজার টাকা ইনস্যুরেন্স ফি।

সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস
সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইন্স দুই ভাগে সেবা দিয়ে থাকে। সাধারণ এবং শুটিং/লিফলেট। সাধারণ কাজের জন্য হেলিকপ্টার ভাড়া ঘণ্টায় ৫৫ হাজার টাকা। আর সিনেমার শুটিং, লিফলেট বিতরণসহ অন্যান্য বাণিজ্যিক কাজের জন্য ভাড়া ৩০ শতাংশ বেশি দিতে হয়। ন্যূনতম ৩০ মিনিটের জন্য হেলিকপ্টার ভাড়া নেওয়া যায়। জ্বালানি খরচ, ইনস্যুরেন্সসহ বাকি সব কিছু কম্পানিই বহন করে থাকে। তবে ভূমিতে অপেক্ষার জন্য আপনাকে ঘণ্টায় দিতে হবে ৫ হাজার টাকা।

সিকদার গ্রুপ
সিকদার গ্রুপের রয়েছে ৩টি হেলিকপ্টার, রয়েছে ৭ এবং ৩ সিটের। ভাড়া সাত সিটের ঘণ্টায় এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। তিন সিটের ঘণ্টায় ৭২ হাজার টাকা। ভূমিতে অপেক্ষা করাতে হলে প্রতি ঘণ্টায় ৭ হাজার টাকা এবং সাথে ভ্যাট।

বুকিং দেয়ার সময় হেলিকপ্টার চার্জের ৫০ ভাগ পরিশোধ করতে হয়। বাকি টাকা দিয়ে দিতে হবে হেলিকপ্টার উড্ডয়নের আগে। হেলিকপ্টার উড্ডয়নের ৪৮ ঘণ্টা আগে কোথায় কেন যাচ্ছেন তা সিভিল এভিয়েশনকে জানাতে হয়। কারণ হেলিকপ্টারের নির্দিষ্ট কোনো রুট নেই। এ কারণে কোনো হেলিকপ্টার আকাশে উড্ডয়ন করলে টাওয়ারকে প্রস্তুত রাখতে হয়, যাতে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়।