পাহাড়ের গায়ে ‘ঊনকোটি’ মুখ

hill

ডেস্ক রিপোর্ট: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডাকোটা অঞ্চলের খুবই পরিচিত মাউন্ট রাশমোর। নামটা অনেকের অজানা থাকলেও, হলিউডের বেশ কিছু ছবিতেই এই পাহাড় দেখা গিয়েছে। দক্ষিণ ডাকোটার বিস্তৃত অঞ্চল থেকে দেখা যায় মাউন্ট রাশমোর, যার চূড়ায় খোদাই করা রয়েছে সে দেশের প্রাক্তন চার প্রেসিডেন্টের মুখ। ১৪ বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করেন প্রায় ৪০০ জন কারিগর এই মুখগুলি তৈরি করতে। ১৯২৭ থেকে ১৯৪২ সালের মধ্যে তৈরি হয় মাউন্ট রাশমোরের ওই চারটি মুখ। কিন্তু, ভারতের ঊনকোটির ইতিহাস বেশ ধোঁয়াশা।

ভারতের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরা। সবুজে মোড়া তার রাজধানী শহর আগরতলা থেকে প্রায় ১৭৮ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে ভারতের ‘এক আশ্চর্য’। যদিও সরকারি মতে ঊনকোটি দেশীয় ‘আশ্চর্যের’ তালিকাভুক্ত নয়।

hill2আগরতলা থেকে গাড়িতে যেতে চার ঘণ্টারও খানিক বেশি সময় লাগে। মসৃণ রাস্তার দু’পাশে ঘন জঙ্গল। নভেম্বরের শুরুতে আবহাওয়া বেশ মনোরম। তবে শীতের শুষ্কতায় ধুলোর আস্তরণে ঢেকে গিয়েছিল বনস্থলি। তারই মাঝে হঠাৎ হঠাৎ উঁকি দিচ্ছিল এক ধরনের বুনো ফুল। পাহাড়ি অঞ্চল, তাই এঁকেবেঁকে রাস্তা চলে গিয়েছে কৈলাশাহর সাব-ডিভিশনের দিকে। যেখানকার বিশেষ দ্রষ্টব্য ও পর্যটন স্থল এই ঊনকোটি।

পাহাড়ের একটা বাঁকে গাড়ি থেকে নেমে কয়েক পা এগোলে আচমকাই চোখের সামনে ভেসে উঠবে এক অসাধারণ দৃশ্য। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল সাইজের নানা মুখ। ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, সেগুলি বিভিন্ন হিন্দু দেবদেবীদের অবয়ব। তবে এই স্থানের মূল খ্যাতি শৈব তীর্থ হিসেবেই।

সঠিকভাবে এখনো জানা যায়নি, কে বা কারা এই কীর্তি স্থাপন করেছিল। তবে, লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় ঊনকোটির বেশিরভাগ মূর্তিই এখনো জঙ্গলে ঢাকা। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ-এর দৌলতে এখন এই স্থান ‘ঐতিহ্য’র তকমা পেয়েছে। চার পাশ দিয়ে সিঁড়ি করা হয়েছে, যাতে পর্যটকরা অনায়াসেই ঘুরে দেখতে পারেন। ভবিষ্যতে এই স্থানের আরো উন্নতির লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে এই সংস্থা। ইউনেস্কোর কাছে ভারত সরকার প্রস্তাবও পাঠিয়েছে, ঊনকোটিকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।
প্রসঙ্গত, দেবদেবীদের মূর্তিগুলি প্রচলিত মূর্তির মতো একেবারেই নয়। তাদের মুখের আদল ত্রিপুরার আদিবাসীদের মতো। এমনকী, তাদের সাজসজ্জাতেও রয়েছে সেখানকার ‘ট্রাইবাল’দের ছাপ।

hill3ঊনকোটির আশ্চর্য এই পাহাড়-শিল্প দেখতে বছরের প্রায় প্রতিদিনই ভিড় জমান পর্যটকের দল। কখনো তারা যান ভিন্ন রাজ্য থেকে, কখনো থাকেন স্থানীয়রাই। এখন পর্যন্ত কোনো প্রবেশমূল্যের প্রয়োজন হয় না। তবে, সতর্ক নজরদারি রয়েছে পাহাড় জুড়ে।

হিন্দু দেবদেবী মানেই পৌরাণিক গল্প। সঙ্গে লোকগাথা। ঊনকোটিও বাদ পড়েনি সেই পরম্পরা থেকে। এ স্থানের নামকরণ নিয়ে রয়েছে তেমনই দুটি গল্প—

ঊনকোটি নাম গল্প-১
মহাদেবসহ এক কোটি দেবদেবী কাশীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। দেবাদিদেব নিজেই ছিলেন সেই যাত্রার নেতৃত্বে। ত্রিপুরার এই বনাঞ্চলে পৌঁছলে রাত নেমে আসে বলে, তিনি সকলকে এ স্থানেই বিশ্রামের জন্য আদেশ দেন। সঙ্গে এও বলেন যে, পর দিন সূর্যোদয়ের আগেই সকললে ঘুম থেকে উঠতে হবে।
কিন্তু, ক্লান্ত দেবদেবীদের কেউই সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠতে পারেননি। অগত্যা, মহাদেব একাই রওনা দেন কাশীর পথে। তবে যাওয়ার আগে তিনি অভিশাপ দেন, যার ফলে সকল দেবদেবীই পাথরের হয়ে যান। সত্যি মিথ্যে যাই হোক, পৌরণিক গল্পের এক অদ্ভুত মজা রয়েছে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলেই মন ভরে যায়।

ঊনকোটি নাম গল্প-২
পৌরাণিক গল্পের পাশাপাশি, যেকোনো জায়গার লোকগাথাও সমান রোমাঞ্চকর হয়। ঊনকোটির তেমনই এক গল্পের নায়ক হল কাল্লু। পেশায় যে ছিল ভাস্কর।
দেবী পার্বতীর এই ভক্তের খুব ইচ্ছে ছিল যে, সে তার আরাধ্য ভগবানের সঙ্গে কৈলাসেই থাকে। এবং পার্বতীও সে ব্যাপারে সম্মতি দেন। কিন্তু, মর্ত্যলোকের বাসিন্দাকে তো আর কৈলাসে থাকার অনুমতি দেওয়া যায় না! তাই ভেবেচিন্তে একটি ফন্দি করেন মহাদেব। তিনি কাল্লুকে বলেন, তার ইচ্ছে তখনই পূরণ হবে যদি সে এক রাতের মধ্যে এক কোটি শিবের মূর্তি তৈরি করতে পারে।

মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করেও কাল্লু সেই অসাধ্য সাধন করতে পারেনি। সকালবেলা মহাদেব গুণে দেখেন যে, আর একটি মূর্তি তৈরি করতে পারলেই কাল্লুর কৈলাস যাওয়া নিশ্চিত ছিল। অর্থাৎ এক কোটির চাইতে একটি কম মূর্তি তৈরি করেছিল কাল্লু। তাই এই স্থানের নাম ‘ঊনকোটি’।

যেভাবে যাবেন:
সড়ক পথে: আগরতলা থেকে সড়কপথে দূরত্ব ১৭৮ কিলোমিটার। কেবলমাত্র যাওয়া আসার সময় লাগে ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা।

রেল পথে: ২০ কিলোমিটার দূরত্বে রয়েছে ধর্মনগর রেল স্টেশন। এখান থেকে গাড়িতে পৌছে যাওয়া যায় ঊনকোটি। আগরতলা থেকে ভোরে ট্রেন ছাড়ে যা সকাল ১০টার মধ্যেই ধর্মনগর পৌছে যায়।

তথ্য ও ছবি : ebela

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]