তাহলে কেন তার নাম দুঃখ?

হাসান মাহমুদ, রাবি: প্রচণ্ড- শীত! মেয়েটা বসে আছে সিরাজগঞ্জের ফুড ভিলেজ নামক একটা রেস্টুরেন্টের সামনের একটু ডান দিকে একটা ছোট কালভাটের্র ওপর। এর একপাশে দুই ভদ্রলোক দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে, তাছাড়া আশেপাশে আর তেমন কেউ নেই। বাস থেকে নেমেই চার দিকে ঘুরে-ফিরে চোখ পড়ল মেয়েটার দিকে। তারকাটা দিয়ে ঘেরা প্রাচীরের ওপারে বাঁশঝাড়ের দিকে মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। একটু পাশে যেয়ে দাঁড়ালাম। আমার দিকে মেয়েটা এমন হিংসা ভরা চোখ নিয়ে তাকাল যে, দেখে মনে হলো যেন প্রচুর রাগে সে ভুরু জড়ো করে দাঁত কিটমিট করছে। প্রথমেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, নাম কী তোমার? সে বলল, তা আপনার কী! তারপর বললাম, নাম বলো না কেন? কি হয়েছে তোমার? সে আবার বলল, তা আপনার কী? আবার জিজ্ঞেস করলাম তোমার কি রাগ হয়েছে?
-হ।
-কেন?
-এমনি।
-কী করছ এখানে বসে?
-কিছু না।
-সকালে কিছু খেয়েছ?
-হ খাইছি।
-কী?
-ভাত।
-শীত লাগছে না তোমার?
-আপনার লাগতেছে না?
-হ্যাঁ। আমার তো লাগছেই।
-তাইলে আমারও লাগতেছে।
– তোমার বাবা কোথায়? তোমার বাবা কী করে?
-বাবা নাই। বাবা আমাগো রাইখা আর একটা বিয়ে কইরা চইলা গ্যাছে। নদী ভাঙনে ওই যে বস্তিটা দেহা যায় দুই-তিন বছর আগে আমরা ওইখানে আইসা উঠছি।
-তোমার মা কী করে? তোমরা কয় ভাইবোন?
-মা বোতল কুড়ায়। আমার ছোট একটা বোন আছে।
-তো এখানে এই শীতের মধ্যে একা বসে আছো কেন?
-আজ সমিতির লোক টাকার জন্য বাড়ীতে আসছিল, মা দিতে পারেনি তাই অনেক বকাবকি, গালিগালাজ করছে। এই জন্য আমার খুব রাগ হইছে তাই বাড়ী থেইক্যা এখানে আইসা বইসা আছি।
-তুমি স্কুলে যাওনা?
-না
-কেন?
-আগে যাইতাম। আব্বা যাওয়নের পর থেইক্যা আর যায় না। মার লগে বোতল কুড়াই।
-স্কুলে যেতে ইচ্ছা হয় না?
-হয়। যাইতে দেয় না। আগে যহন স্কুলে যাইতাম খুব মজা হইত। সবাই একলগে যাইতাম আবার আয়তাম। আমার ব্যাগ আছিল না আমি হাতে কইরা বই নিয়া যাইতাম। তারপরে মা আর টাকা দিতে পারল না তাই আর যায় না।

এরপর আমার বাসের হর্ণ আমাকে ডাক দিলো। মেয়েটার সাথে আর কথা বলা হলো না। জানা হলো না আরো অনেক কথা, অনেক অভিমান। জানা হলো না প্রাচীরের ওই পাশে বাতাসে ওড়া সকালের শিশির জড়ানো বাঁশের পাতার দিকে তাকিয়ে কী ভাবছিল? সে কি আগামীতে কোন সুখের কথা ভাবছিল না অতীতে হারানো কোন প্রাপ্তি? জানা হলো না তার নাম! তার নাম হতে পারত আনন্দ কিংবা আহ্লাদী। হতে পারত না কোন বড়লোক বাবার আদুরে মেয়ে? হতে পারত কোন এক মায়ের এমন এক মেয়ে, যার এক চিলতে হাসির অন্তরঙ্গতাকে গ্রহন করার জন্য হাজার প্রশ্ন কে বাতিল করে দিতে পারার মতো দাম্ভিকতা।
তাহলে, তাহলে কেন তার নাম দুঃখ?

news portal website developers eCommerce Website Design