ঋণের দায়ে কিডনি বিক্রি করে এখন ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন তারা!

চঞ্চল বাবু, (কালাই) জয়পুরহাট: ‘ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে এবং অর্থের মোহে পড়ে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে সাত বছর আগে আমি আমার শরীরের মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রি করার সঙ্গে সঙ্গে নিজের কর্মক্ষমতাকেও বিক্রি করেছি। এখন আমি আর কোনো কাজকর্ম করতে পারি না। নিজেকে বড় অসহায় আর অপরাধী মনে হয়। আমি যে ভুল করেছি, এমন ভুল যেন আর কেউ না করে।’ এমন কথাই বলছিলেন জয়পুরহাট জেলার কালাই উপজেলার ভেরেন্ডি গ্রামের এক কিডনি বিক্রেতা মেহেরুল ইসলাম।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমি ভালো নেই। ভারী কোন কাজ করলে, হাঁটাচলা করলে সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা হয়। মাঝে মধ্যেই জ্বর হয়, প্রস্রাবে জ্বালা-যন্ত্রণা হয়, হয় শ্বাসকষ্টও।’

কেবল মেহেরুলই নয়, একই ধরনের কথা জানান উপজেলার বোড়াই গ্রামের কিডনি বিক্রেতা জোসনা বেগম, আইনুল ইসলাম, ভেরেন্ডি গ্রামের আক্তার ও বাগইল গ্রামের মিজানসহ অনেকেই।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার কয়েকটি গ্রামের কিডনি বিক্রেতারা বর্তমানে সকলেই অসুস্থ। ঋণের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে যে মানুষগুলো একটু উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখেছিল, রোগ-শোকে কর্মশক্তি হারিয়ে অসুস্থ হয়ে এখন তারা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ৫ থেকে ৭ বছর আগে কিডনি দেয়া এ মানুষগুলো এখন নানা ধরনের সমস্যায় ভুগছেন। এদের কোমরে ব্যথা হয়, মাঝে মধ্যেই জ্বর হয়, প্রস্রাবে জ্বালা-যন্ত্রণা হয়। একটু হাঁটাচলা করলেই শাসকষ্ট দেখা দেয়। ভারী কাজ একেবারেই করতে পারছেন না তারা। এ ছাড়া সমাজে কিডনি বিক্রি করা মানুষ হিসেবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

কালাই উপজেলার মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি গ্রামের ছোট্ট একটি পান-সিগারেটের দোকানে কথা হলো আকতার আলমের সঙ্গে। তিনি ২০০৯ সালে দালালের খপ্পরে পড়ে তার শরীরের মুল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রি করেছিলেন। ৪ লাখ টাকায় কিডনির দর দাম ঠিকঠাক হলেও প্রতারণার শিকার হয়ে মাত্র ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন তিনি। ওই টাকা দিয়ে ৫টি এনজিওর ঋণের আসল টাকা পরিশোধ করেছেন। এখনো গ্রামীণ ব্যাংকের কিস্তির বোঝা টানছেন তিনি। এখন পাড়ার ছেলেরা ছোট একটি দোকান করে দিয়েছে তাকে। এ দিয়ে দুমুঠো খেয়ে, ২ সন্তান নিয়ে অভাব অনটনের মধ্যে দিন কাটছে তার।

জীবনের ভুল কাজের অনুশোচনা করে তিনি জানান, আগে মানুষের বাড়িতে কাজ করে, কখনো ভ্যান চালিয়ে রোজগার করতেন। দিনে ১শ টাকা পেলেও শারীরিকভাবে সুস্থ ছিলেন। আর এখন অন্যরা দিনে ৫শ থেকে ১ হাজার টাকার কাজ করলেও তার করার আর কিছুই নেই। তিনি আর কাজ করতে পারছেন না। অনেক টাকার ঔষধ কিনতে হচ্ছে প্রতি মাসে। এ ছাড়া পাশের বোড়াই গ্রামের আইনুল ইসলাম, জোসনা বেগম সবাই জানালেন তাদের অসুস্থতার কথা।

বোড়াই গ্রামের জোসনা বেগম জানান, ৬-৭ বছর আগে উপজেলার বৈরাগিরহাটে দালালের খপ্পরে পড়ে কিডনি বিক্রেতাদের সহায়তার জন্যে চিকিৎসা ক্যাম্প বসেছিল। যেখানে সিভিল সার্জনসহ বড় বড় কর্মকর্তারা এসেছিলেন। দিয়েছিলেন চিকিৎসা ও সুপরামর্শ। কিডনি দেয়া অসুস্থদের সরকারি হাসপাতালে বিনা খরচে চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও সেদিন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে চিকিৎসার পরিবর্তে উল্টো লাঞ্ছনার অভিযোগ রয়েছে। ২০১১ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের ১২০ জন মানুষ কিডনি বিক্রি করেছিল। এরপর আর সঠিক পরিসংখ্যান নেই উপজেলা প্রশাসন এবং সিভিল সার্জনের কাছে। তবে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, কিডনি বিক্রি এখনো থেমে নেই।

স্থানীয় সাংবাদিক এবং জনপ্রতিনিধিদের মতে, কিডনি বিক্রেতার সংখ্যা তিন শতাধিক। মাত্রাই ইউনিয়নের ভেরেন্ডি, উলিপুর, সাতার, কুসুমসাড়া, অনিহার, পাইকশ্বর ও ইন্দাহার, উদয়পুর ইউনিয়নের বহুতি, জয়পুর বহুতি, নওয়ানা, নওয়ানা বহুতি, দুর্গাপুর, উত্তর তেলিহারা, তেলিহারা, ভুষা, কাশীপুর, বিনাই ও র্পূর্বকৃষ্টপুর এবং আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাঘবপুর ও বোড়াই গ্রামের লোকজন বেশি কিডনি বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া নতুন করে আশপাশের অনেকে কিডনি বিক্রি করেছেন বলে জানা গেছে।

কালাই পৌরসভার মেয়র হালিমুল আলম জন বলেন, কিডনি বিক্রি এখনো থেমে নেই। কয়েক মাস আগে তিনি ভারতের এক হাসপাতালে গিয়েও এলাকার মানুষকে কিডনি বিক্রির জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে দেখেছেন। তিনি মনে করেন, অভাব আর ঋণের কারণে কিডনি বিক্রি করছে, পুরোপুরি এমনটি নয়। লোভে পড়ে কিছুটা আয়েশী জীবন যাপনের আশায় তারা শরীরের মূল্যবান অঙ্গ কিডনি বিক্রি করছেন।

মাত্রাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ ন ম শওকত হাবিব তালুকদার লজিক বলেন, কয়েক বছর আগে কিডনি বিক্রির যে প্রবণতা ছিল, তা অনেকটা কমে গেছে। কিডনি বিক্রি রোধে তারা জনসচেতনামূলক কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছেন।

জয়পুরহাট জেলা সিভিল সার্জন ডা. হাবিবুল আহসান তালুকদার রেজা বলেন, কেবল কিডনি দেয়ার কারণেই কিডনি দাতাদের শরীরের নানা রকম উপসর্গ দেখা দিয়েছে, এ কথা ঠিক নয়। তিনি মনে করেন, অপুষ্টিসহ নানা কারনে একজন সাধারণ মানুষের মতো এসব কিডনি দাতারাও অসুখে পড়তে পারেন। তবে আমাদের কাছে এলে তারা সঠিক চিকিৎসা সেবা পাবেন।