সাতক্ষীরায় নলকূপে পানি উঠছে না

satkhira map

satkhira mapসাতক্ষীরা: চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াতে জেলার বেশিরভাগ নলকূপে পানি উঠছে না। কিছু এলাকার নলকূপগুলোতে সীমিত পরিমানে পানি উঠলেও বেশিরভাগ নলকুপে আর্সেনিক থাকায় ওই পানি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ পুকুর শুকিয়ে গেছে। ফলে গোটাজেলাতে বিশুদ্ধ খাবার পানি পেতে হিমশিম খাচ্ছে ২২ লক্ষ মানুষ। জলবায়ু ট্রাস্টের অর্থায়নে বিভিন্ন এনজিও সংস্থার মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হলেও তার যথাযথ সুফল পায়নি স্থানীয়রা। বিশেষ করে জেলার আশাশুনি,কালীগঞ্জ, শ্যামনগর উপজেলার উপকুলীয় এলাকায় দেখা দিয়েছে তীব্র বিশুদ্ধ পানির সংকট।

সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্ত সূত্রে জানা যায়, সরকারি হিসাব মতে জেলায় মোট ৩৩ হাজার ৩৪১টি হস্তচালিত নলকূপ রয়েছে। যার মধ্যে অকেজো রয়েছে ৩ হাজার ৮৮০টি এবং সচল রয়েছে ২৯ হাজার ৪৬১টি। তবে বাস্তবতা হলো অকেজোর সংখ্যা আরো বেশি। জেলায় অগভীর নলকূপ চালু রয়েছে ১২ হাজার ৯৪টি এবং অকেজো রয়েছে ২ হাজার ৫৬৫টি। গভীর নলকূপ চালু রয়েছে ৯ হাজার ২১টি এবং অকেজো রয়েছে ২৭৬টি। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে চালু রয়েছে ৫ হাজার ৩০৭টি এবং অকেজো রয়েছে ৪৭৩টি। কলারোয়ায় চালু রয়েছে ৪ হাজার ৮৬৯টি এবং অকেজো রয়েছে ৪২১টি। তালায় চালু রয়েছে ৪ হাজার ৯২০টি এবং অকেজো রয়েছে ১৮৪টি। আশাশুনিতে চালু রয়েছে ৪ হাজার ৫৫৪টি এবং অকেজো রয়েছে ৩০৭টি।
দেবহাটায় চালু রয়েছে ২ হাজার ৮২৫টি এবং অকেজো রয়েছে ১১২টি। কালিগঞ্জে চালু রয়েছে ২ হাজার ৮৯২টি এবং অকেজো রয়েছে ৪৭৩টি। শ্যামনগরে চালু রয়েছে ৩ হাজার ৮৮২টি এবং অকেজো রয়েছে ৪১৩টি। তবে যে সব নলকূপ রয়েছে তার বেশির ভাগই আর্সেনিক যুক্ত। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্ত সাতক্ষীরায় বিপুল পরিমানে নলকূপ ও তার সরাঞ্জম পড়ে আছে। অনুমোদন পেলে সেগুলো জেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হবে বলে সূত্র জানায়।
সাতক্ষীর জেলায় বিগত ২০০৩ সালে একবার টিউবওয়েলে আর্সেনিক পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওই সময় পরীক্ষা শেষে টিউবওয়েলের মুখে লাল-সবুজ রঙ লাগিয়ে সতর্ক করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। সে সময় লাল রঙ (বিপদ সঙ্কেত) চিহ্নিত নলকূপের মালিকেরা প্রতিকারের আশায় পানি পান করা থেকে বিরত থাকে। একপর্যায়ে বছরের পর বছর সুফলবঞ্চিত মানুষেরা বাধ্য হয়েই ওই সব নলকূপের পানি আবার পান বা ব্যবহার শুরু করে।
শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবন সংলগ্ন উপকুলীয় তারানীপুর গ্রামের মাগফুর রহমান জানান, চলতি সুষ্কমৌসুমে বৃষ্টি না হওয়ায় পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় নলকুপে পানি উঠছে না ।
আমাদের উপকুলীয় এলাকা বছরে ৩-৪ মাস বৃষ্টির পানি রিজার্ভ ট্রাঙ্কিতে রেখে পান করে থাকি । । বৃষ্টি না হওয়ায় অধিকাংশ ট্রাঙ্কির পানি অনেক আগেই শেষ হয়েছে । খননকৃত সংরক্ষিত অধিকাংশ পুকুরের পানি শেষ হয়েছে দু একটি পুকুরের পানি সামান্য থাকলেও লবনাক্ত দেখে দিয়েছে । ফলে দেখে দিয়েছে উপকুলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানি তীব্র সংকট।
জেলায় শতকরা কতভাগ মানুষ সুপেয় পানি পান করছেন তার কোনো সঠিক তথ্য জনস্বাস্থ্য প্রকৗশল অধিদপ্তরে নেই। কাগজপত্রে ৮০ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছে-এমনটা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। চলতি বছরে জেলায় ২৪৩টি সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। পানির বিভিন্ন উৎস বাবদ জেলাতে নলকূপ, পুকুরসহ বিভিন্ন উৎস প্রকল্প তদারকি করেছে জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী।
বাস্তবায়নকৃত প্রকল্পের ৫০ ভাগ স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাকি ৫০ শতাংশ স্থানীয় উপজেলা পরিষদ বাস্তবায়ন করেছে। খাতা কলমে যার বেশির ভাগ কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে। কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আমিনুল ইসলাম জানান, জেলায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে। মিষ্টি পানির বিভিন্ন উৎস নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে সুপেয় পানির উৎস তৈরি করতে নানা মুখি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। অকেজো নলকুপ সমূহ কার্যকর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নতুন নতুন মিষ্টি পানির উৎস তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে উপকুলীয় জেলা হওয়াতে পানিতে দিন দিন লবণাক্ততা ও আর্সেনিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংকট সমাধান কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।
এবিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইফতেখার হোসেন জানান, সাতক্ষীরায় সুপেয় পানির উৎস তৈরি করতে সরকার কাজ করছে। জার্মান ভিত্তিক একটি সংস্থা, সাতক্ষীরা পৌরসভায় ১৮০ কোটি টাকার একটি বাজেট দিয়েছে। প্রকল্পনুযায়ী চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে কাজ শুরু হবে।
শ্যামনগরে মিষ্টি পানির উৎস তৈরিসহ পরিবেশ বিপর্যয় রোধে জেলাতে ৪’শ কোটি টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। শ্যামনগরে সুপেয় পানি, পানি ধরে রাখা এবং জনসাধরণের কাছে সেই সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হতে পারে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সাতক্ষীরাতে সুপেয় পানির উৎস তৈরিসহ পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করা অনেকটা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

news portal website developers eCommerce Website Design