মে দিবস কী জানে না হবিগঞ্জের ইটভাটা শ্রমিকরা

হবিগঞ্জ: আজ দিনটা শ্রমিকদের। সারাদেশে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। কিন্তু সে হিসেব নেই তাদের কাছে। কাজ করেই যাচ্ছেন হবিগঞ্জ ইটভাটা শ্রমিকরা।শ্রমিকরা যখন ছুটিতে তখন ইটভাটা শ্রমিকরা গ্রীস্মের কাঠফাঁটা রোদের মধ্যে কাজ করছে। সকাল পেরিয়ে দুপুরের খরতাপে মাথা থেকে কপাল চুইয়ে মুখ গড়িয়ে পড়ছে ঘাম। সারা শরীর জবজবে ভেজা। জীর্ণ শীর্ণ শরীরটা দেখলেই বোঝা যায় কেমন খাটুনি খাটতে হয় মানুষগুলোকে।

তারা জানে না মে দিবস কী, মে দিবসের ছুটির কথা শুনে তারা শুধু হাসছেন, সমাজের অনেকে হাসতে না জানলেও খেটে খাওয়া এ শ্রমিকরা প্রাণ খুলে হাসতে জানে! তারা ইটভাটা শ্রমিক, মাটি পুড়িয়ে ইট তৈরিতে দিনভর শ্রম দেন তারা।

মঙ্গলবার দুপুরে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ভরসা ইটভাটায় গিয়ে শ্রমিকদের কর্মযজ্ঞের এমন চিত্রই দেখা গেল। আলাপে তারা জানালেন, ইটভাটায় অমানবিক কষ্টের কাজেও এ হাসি-খুশিটাই তাদের জীবনকে সচল রেখেছে।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুখে হাসি নিয়ে কাজ করলেও তাদের দুঃখের সীমা নেই। সমাজ ও সভ্যতার ক্রমাগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠছে একের পর এক দালান কোঠা। এক এক করে ইটের গাঁথুনিতে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন।

কিন্তু রোদে পুড়ে এই ইট যারা তৈরি করেন তারা এক জীবন খাটুনি করেও স্বপ্ন দেখতে পারেন না দুই কামরার একটি ইটের ঘরের। এ স্বপ্নটা তাদের অধরাই থেকে যায়। তাদের জীবনটা যেন দুর্বিষহ।

একে তো স্বল্প মজুরি, তার উপর বছরের অর্ধেকটা সময়ই কাজ থাকে না, বাকি সময়টা খুঁজতে হয় অন্য কাজ। তারপরও পেটের জ্বালায় বারবার ফিরে আসেন এই ঘাম ঝরানো শরীর পোড়ানো কাজে।

বাহুবল উপজেলার শ্রীমঙ্গল রোডের মেঘনা ব্রিকসের জমির হোসেনের সঙ্গে আলাপে জানালেন ইটভাটায় নিত্যদিন হারখাটুনি পরিশ্রমের কথা। তার বাড়ি ময়মনসিংহে। ইট পোড়ানোর মৌসুমে আরও কয়েকজনের সঙ্গে তিনিও গত কয়েকবছর ধরে এই ইটভাটায় কাজ করেন।

তিনি জানান, ‘পুরা ছয় মাস খাটলে ৬০ হাজার ট্যাহা দেয়। তাও এই ট্যাহা পাইতাছি কারিগর অওনের (হওয়া) পর। পইলা (প্রথম) ছয় মাস কাজ করলে পাইতাম ২০ হাজার ট্যাহা।’

জমির জানালেন, তিনিও স্বপ্ন দেখেন একদিনতার ইটের তৈরি বাড়ি হবে। তার ভাষায়, আবার এইডাও ভাবি এই মজুরিতে কী সম্ভব? যেখানে বউ-বাচ্ছা লইয়া দুই বেলা খাইবারই পারি না। লাখ ট্যাহার বাড়ি কী করে বানামু!

শুধু জমিরই নন, একই অবস্থা মনির হোসেন, শাহ আলমসহ আরও অনেক ইট শ্রমিকের। তারা জানান, বছরের ছয় মাস ইটভাটাগুলোতে পুরোদমে কাজে ব্যস্ততা থাকে। আর বাকি ছয় মাস কেউ ক্ষেতে-খামারে কাজ করেন। আবার কেউ বা রিকশা, ভ্যান, ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। আবার অনেকে বেছে নেন রাজমিস্ত্রির জোগালি কিংবা দিনমজুরির কাজ।

শ্রমিকরা জানান, বছরের নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইট বানানোর কাজ করতে হয় তাদের। আর এই কাজটি চুক্তি ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এ কাজে আসতে হয় মাঝির (সর্দার) মাধ্যমে। পুরো ছয় মাসের জন্য মালিকের হয়ে মাঝিই শ্রমিকের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন করেন।

কাজ শুরু হওয়ার আগে মাঝি কিছু টাকা অগ্রিম দিয়ে শ্রমিককে দাদন (বুকিং) দিয়ে রাখেন। মোজাম্মেল নামের এক মাঝি (সর্দার) জানান, প্রথমেই তিনি ইটভাটা মালিকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নেন। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিক সংগ্রহ করে চুক্তি ভিত্তিতে কাজ করান।

তথ্য অনুযায়ী, ইট বানানোর কারিগরদের দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি টাকা। পুরো মৌসুমে দৈনিক ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করে কারিগর ৭০ থেকে ৮০ হাজার, জোগালি ২০ থেকে ৫০ হাজার, আগাটপ (সহযোগী) ৬০ থেকে ৭০ হাজার, গোড়ারটপ (সহযোগী) ৬৫ থেকে ৭৫ হাজার, মাটি বহনকারী ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন।

তবে প্রতিদিন কাজ শেষে দেয়া হয় খোরাকি (খাবার)। সাতদিনে এই খোরাকি জনপ্রতি শ্রমিক পান ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে। দিনের বেলা রোদ উপেক্ষা করে খোলা আকাশের নিচে কাজ করতে হয় শ্রমিকদের, রয়েছে কয়লার আগুনে ইট পোড়ার তীব্র তাপ।

ইটভাটায় কাজ করা এসব শ্রমিকদের কোনো ভালো আবাসস্থল নেই। ইটভাটার পাশেই টিন দিয়ে ছাপড়া ঘর তুলে কোনোমতে তাদের রাত পার করতে হয়।

এ বিষয়ে শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত হবিগঞ্জ ইটভাটা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান মাসুম বলেন, ইটভাটায় শ্রমিকরা চরমভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। পাচ্ছে না ন্যায্য মজুরি তবু শ্রমিকরা পেটের দায়ে রোদে পুড়ে এ কাজ করছে।

তিনি আরো বলেন, তাদের নেই সাপ্তাহিক ছুটি, নেই কোনো নিয়োগপত্র, কোনো কর্মঘণ্টা, শ্রমিক রেজিস্ট্রার, নেই ছুটির রেজিস্ট্রার, নেই ব্যক্তিগত নিরাপত্তা উপকরণ। তারা এখনো জানে না মে দিবস কী। সুনির্দিষ্ট শ্রম কাঠামোতে আনা হলে এসব শ্রমিক উপকৃত হবে বলেও জানান তিনি।

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]