পুলিশের হাতে ৪ ক্লু

taspia ctg

taspia ctgডেস্ক রিপোর্ট: চট্টগ্রাম সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিনের মৃত্যু রহস্যের কূল-কিনারা এখনো করতে পারেনি পুলিশ। তাসফিয়া খুন হয়েছে নাকি আত্মহত্যা করেছে সে বিষয়ে পুলিশ কোনো তথ্য দিতে পারেনি। তবে ফিরোজ নামে এক যুবলীগ নেতাকে খুঁজছে পুলিশ। সে সঙ্গে একটি আংটি, অটোরিকশা চালকের সন্ধান এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে এ মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হবে বলে পুলিশের ধারণা।

পুলিশের তথ্যমতে, ১লা মে বিকালে তাসফিয়া নিখোঁজের পর তার মায়ের ফোন পেয়ে আদনান তাদের বাসায় যায়। এ সময় তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন প্রথমে আদনানকে নিয়ে চায়না রেস্টুরেন্টে যান। সেখান থেকে আবারও বাসায় আসেন। সেখানে আদনানকে আটকে রাখেন তিনি। খবর পেয়ে যুবলীগ নেতা ফিরোজ ও যুবলীগ কর্মী আকরাম তাসফিয়াদের বাসায় আসেন। এ সময় আদনানকে ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দেন তারা। পরে দুই ঘণ্টার মধ্যে তাসফিয়াকে বাসায় ফেরত দেয়ার কথা বলে আদনানকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। এরপর লাপাত্তা হয়ে যান তারা।

ওই রাত শেষে বুধবার সকালে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নেভাল একাডেমির অদূরে ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় থেকে তাসফিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে উদ্ধার করলেও দুপুর ২টার সময় পরিচয় মিলে।

তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল প্রতিবেদনে উঠে আসে এই কিশোরীর ওপর চালানো ভয়াবহ চিত্র। নিহত তাসফিয়ার পিঠ, বুক ও সপর্শকাতর অঙ্গসহ সব স্থানেই দেখা গেছে ভয়াবহ নির্যাতনের ছাপ। গোলাকার মুখমণ্ডল থেঁতলানো। চোখ দুটো নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আর বুকের ওপর একাধিক আঁচড়ের দাগও দেখা গেছে। নিহতের হাতের নখগুলো ছিল নীলবর্ণ।

৩রা মে দুপুরে তাসপিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন কন্যা হত্যার অভিযোগে আদনান মির্জা ও সুনির্দিষ্ট ছয়জনকে আসামি করে পতেঙ্গা থানায় মামলা করেন। ওই মামলার ষষ্ঠ নম্বর আসামি ফিরোজ।

তিনি প্রধান আসামি আদনান মির্জার বড় ভাই। ফিরোজের পরিচালিত রিচকিডস নামের গ্যাং স্টারের (এডমিন) প্রধান আদনান। আর বাকি ৫ আসামি সেই গ্যাং স্টারের ক্যাডার।

পুলিশ জানায়, যুবলীগ ক্যাডার ফিরোজ অস্ত্রসহ এক সময় র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছিল। ভারতে বন্দি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাজ্জাদের সহযোগী সে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এবং ২০১৩ সালের জুলাই মাসে অস্ত্রসহ দুবার আটক হয় পুলিশের হাতে।

জেল থেকে বেরিয়ে ২০১৫ সাল থেকে ফিরোজ যুবলীগের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়। সে সময় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনের ছবি ব্যবহার করে বিলবোর্ড টাঙিয়ে সমালোচনায় আসে ফিরোজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের চাঁদাবাজি ও খুনের অপারেশনে সক্রিয় ছিল ফিরোজ। এক সময় যৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে সীমান্ত পাড়ি দিলেও সব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো সাজ্জাদ বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ফিরোজের মাধ্যমে।

এছাড়া ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে, নগরীর গোলপাহাড় মোড়ে রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাসফিয়া যে অটোরিকশায় উঠেছিলেন, সেই অটোরিকশায় করেই তিনি পতেঙ্গায় পৌঁছান। সেই অটোরিকশায় তাসফিয়া এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো ছিলেন। এই সময়ে কোনো ফাউল প্লে হয়েছিল কি না পুলিশ সেটা খতিয়ে দেখছে।

এছাড়া রেস্টুরেন্টের ভিডিও ফুটেজে তাসফিয়ার আঙুলে একটি সোনার আংটি দেখা গিয়েছিল। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের সময় সেটি পাওয়া যায়নি। পুলিশের ধারণা, তাসফিয়া ওই আংটি অটোরিকশা চালককে দিয়ে ভাড়া মিটিয়েছে।

৪ঠা মে নগরীর গোলপাহাড় মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত চারটি প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। এরপর সন্ধ্যায় পতেঙ্গার নেভাল এলাকায় গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি-কর্ণফুলী জোন) জাহেদুল ইসলাম।

তিনি বলেন, তাসফিয়া গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে যে অটোরিকশায় উঠেছিলেন সেটি আনুমানিক একশ গজ দূরে মেডিকেল সেন্টারের সামনে গিয়ে থামে এবং তাসফিয়া নেমে যান। সেখানে ৭ সেকেন্ড অপেক্ষার পর তাসফিয়া আবারও অটোরিকশায় উঠলে সেটি চলতে শুরু করে। ৬টা ৪৮ মিনিটে অটোরিকশাটি জিইসি মোড়ের দিকে যাত্রা করে। এরপর রাত সোয়া ৮টায় তাসফিয়াকে নেভালে পাথরের ওপর একাকী বসে থাকতে দেখা গেছে।

তিনি বলেন, এ থেকে আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি, তাসফিয়া যে অটোরিকশায় করে চায়না গ্রিলের সামনে থেকে রওনা হয়েছিলেন, সেই অটোরিকশাতেই পতেঙ্গায় পৌঁছেন। এর মধ্যে তাসফিয়া বাসার দিকে যায়নি, এটাও আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

সূত্রমতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের পরও পুলিশ সিএনজি অটোরিকশার নম্বর পেতে ব্যর্থ হয়েছে। অটোরিকশাটি চিহ্নিত করতে পারলেও প্রতিটি ফুটেজে অতিরিক্ত আলোর কারণে নম্বরটি পাওয়া যায়নি।

জাহেদুল ইসলাম আরও বলেন, তাসফিয়ার আংটি, অটোরিকশার চালক এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও আদনানের রিচ কিডস গ্যাং ও কথিত বড় ভাই ফিরোজকে নিয়ে কাজ করছি। এছাড়া আরো কিছু ক্লু মিলেছে যেগুলো এই মুহূর্তে তদন্তের স্বার্থে প্রকাশ করা যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, বুধবার (২রা মে) সকালে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটের পাথরের ওপর থেকে সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়া আমিনের (১৬) মরদেহ উদ্ধার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ। পরে একই দিন সন্ধ্যায় নগরের খুলশী থানার জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটি এলাকা থেকে পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাসফিয়ার প্রেমিক আদনান মির্জাকে আটক করে। আদনান মির্জা বাংলাদেশ এলিমেন্টারি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র এবং ব্যবসায়ী ইস্কান্দার মির্জার ছেলে। সূত্র: মানবজমিন

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]