যেভাবে ধরা পড়লো কয়লা খনির দুর্নীতি

boropukuria

boropukuriaডেস্ক রিপোর্ট: দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সারা দেশে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীও। কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, এতো বড় কারসাজি হলো কীভাবে। কয়লা ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বলছেন, খনি শ্রমিকদের প্রায় এক মাস আন্দোলনের সময়ে কয়লা উত্তোলন না হওয়া এবং কিছুদিন আগে উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ফেইজ বন্ধ করে দেওয়ার ফলেই কয়লার ঘাপলা ধরা পড়েছে। তবে খনির কয়লা গায়েব বা ঘাপলার এই ঘটনা নতুন নয় জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিও বাণিজ্য, উত্তোলনকৃত কয়লার হিসেবে গড়মিল, কাগজ-কলমে ও ওজনে কারচুপিসহ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম করে আসছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের অজানা ছিল না।

এদিকে দুদক বলছে, কাগজে-কলমে যে পরিমাণ কয়লা থাকার কথা সেই পরিমাণ কয়লা বাস্তবে নেই। হিসেবের গরমিলেই এই দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মে থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিকরা ১৩ দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন। ফলে খনি থেকে কয়লার উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এই খনির ১২১০ নম্বর ফেইজ থেকে দিনে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন হতো। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, কোল ইয়ার্ডে (কয়লা রাখার জায়গা) প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা রয়েছে। এই পরিমাণ দিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে কোনও সমস্যা হবে না।

দাবি দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাসে ২১ দিন কয়লা উত্তোলন বন্ধ রাখার পর গত ৩ জুন কাজে যোগদান করেন শ্রমিকরা। কিন্তু ওই ফেইজে উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১৬ জুন থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। গত ২০ জুনও কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা রয়েছে। কিন্তু গত ১৬ জুলাই কর্তৃপক্ষ ফের জানায়, কয়লার মজুত শেষের দিকে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পিডিবিকে জানালে তারা এটি পেট্রোবাংলাকে অবহিত করে। এরপরই বের হয়ে আসে কয়লার ঘাপলার বিষয়টি।

খনির কোল ইয়ার্ড থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ১৯ জুন খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলায় সংযুক্ত ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়। এই ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক (তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) মাহবুবুর রহমান জানান, ‘গত ২০ জুন বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এক লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন কয়লার মজুত রয়েছে বলে জানায়। সেই হিসেবেই পরিকল্পনা করে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে কয়েকদিন আগে খনি কর্তৃপক্ষ পিডিবিকে জানিয়ে দেয় খনির কোল ইয়ার্ডে কয়লার মজুত প্রায় শেষের দিকে। বিষয়টি জানার পর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে এমন আশঙ্কায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। অবশেষে গত রবিবার (২২ জুলাই) রাতে কয়লার অভাবে বন্ধ করে দিতে হয় তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন।’

তিনি জানান, ৫২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট চালু রাখতে দৈনিক কয়লার প্রয়োজন ৫ হাজার ২’শ মেট্রিক টন কয়লা। কিন্তু বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি চলতি জুলাই মাস থেকে কয়লার সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি ইউনিট। অপর ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন আরেকটি ইউনিট মেইনটেনেন্সের জন্য এর আগে থেকেই বন্ধ রাখা হয়। ফলে ২৭৫ মেগাওয়াট বিদুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন তৃতীয় ইউনিটটি কোনোমতে চালু রাখা হয়েছিল। এরপরও এখানে দৈনিক প্রায় ৮শ’ থেকে এক হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হতো।

ব্যবসায়ীরা জানান, কয়লা উত্তোলন বন্ধ থাকার ফলেই ধরা পড়েছে কয়লা গায়েব হওয়ার বিষয়টি। কাগজ-কলমে ঠিক থাকলেও বাস্তবে কয়লা ছিল না। ডিও বাণিজ্য, ওজনে কারচুপি এবং কাগজে-কলমে হেরফের দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছেন কর্মকর্তারা।

কয়লা ব্যবসায়ী মশিউর রহমান বুলবুল বলেন, ‘কয়লা খনির কর্মকর্তারা কাগজ-কলমে হেরফের করে এবং ওজনে কারচুপি করে অবৈধভাবে কয়লা বিক্রি করে থাকে। প্রায় দেড় মাস ধরেই বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। বিক্রি বন্ধ থাকলেও তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে কয়লা দিতে হতো। তাই যে পরিমাণ কয়লা মজুত ছিল তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কাগজ-কলমে মজুতের পরিমাণ অনেক বেশি থাকলেও বাস্তবে তা ছিল না। দীর্ঘদিন ধরেই কয়লা খনির কিছু কর্মকর্তা অবৈধভাবে কয়লার ঘাপলা করে আসছিল। কিন্তু উত্তোলন বন্ধ থাকার ফলেই এবারে ঘাপলার বিষয়টি উন্মোচিত হয়েছে।’

কয়লা ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, ‘খনি থেকে যে পরিমাণ কয়লা বিক্রি হয়, কর্মকর্তাদের যোগসাজশে তার চেয়ে বেশি পরিমাণ কয়লা দিয়ে দেওয়া হয়। ভুয়া কাগজপত্র ও হেরফেরের মাধ্যমে এই কয়লা বিক্রি করে আসছে কিছু কর্মকর্তা। তাই কাগজপত্রে ঠিক থাকলেও বাস্তবে সেই পরিমাণ কয়লা ছিল না। কয়লার উত্তোলন বন্ধ থাকায় এবার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ব্যবসায়ী জানান, ‘খনি থেকে যে পরিমাণ কয়লা উত্তোলন হয়, কাগজ-কলমে তার চেয়ে বেশি দেখানো হয়। এতে করে প্রফিট-বোনাস বেশি পান কর্মকর্তারা। ২০০৫ সাল থেকে এই পর্যন্ত কোল ইয়ার্ডে কয়লা থাকায় বিষয়টি ধরা পড়েনি। ঘাপলার বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাবে এটি কেউই ভাবেনি।’

তিনি আরও জানান, ‘কর্মকর্তাদের যে বেতন তাতে করে সচ্ছলভাবে চলা সম্ভব। কিন্তু তারা প্রতিজন বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানীয়ার ঢাকায় চারটি বাড়ি, মাসুদুর রহমান হাওলাদারের দুইটি বাড়ি ও ৩৫/৪০ লাখ টাকা মূল্যের চারটি মাইক্রোবাস রয়েছে। একইভাবে মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী, কামরুজ্জামানসহ অন্যান্য কর্মকর্তারাও বাড়ি-গাড়ির মালিক ও কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন।’

কয়লা ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, ‘২০১৭ সালে খনি থেকে ৩০০ টন কয়লা চুরি হয়েছিল। পরে বিষয়টি ফাঁস হয়ে গেলে খনির কর্মকর্তারা রাতারাতি সেই ৩০০ টন কয়লার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে সমন্বয় করে। এতেই প্রমাণিত হয় কর্মকর্তারাই এই কয়লা চুরি ও ঘাপলার সঙ্গে জড়িত।’

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সম্পাদক এসএম নুরুজ্জামান জানান, ‘মন্ত্রী-এমপি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন নামে কয়লার ডিও দেন। এই ডিওতে যে পরিমাণ কয়লা দেওয়ার কথা তার বেশি পরিমাণ কয়লা দেওয়া হয়। এতে করে লাভবান হন কর্মকর্তারা। ডিওর মাধ্যমে খনি থেকে নেওয়া এক টন কয়লার দাম ১৭ হাজার টাকা হলেও বাজারে এর দাম ২০ হাজার টাকা। ১০০ টন কয়লার ডিও মানে দুই লাখ টাকা, এভাবে কোটি কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হয় কয়লা খনিতে। আর এই টাকা ভাগাভাগি হয় কর্মকর্তাদের মধ্যে। কিন্তু এবারে তারা আটকে গেছেন গ্যাঁড়াকলে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি রবিউল ইসলাম জানান, ‘আন্দোলন শেষ হওয়ার পরে সামান্য কয়লা উত্তোলন করা হয়েছে। ফলে কয়লার যে মজুত ছিল তা ধীরে ধীরে কমে যেতে শুরু করে।’

এদিকে কয়লা গায়েবে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা। কাগজ-কলমের হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই বলে জানিয়েছে দুদক। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিনাজপুর সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক বেনজীর আহমেদ জানান, ‘আমরা কয়লা খনির কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে দেখেছি, খনির কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৪৬ হাজার মেট্রিক টন কয়লা মজুত থাকার কথা। কিন্তু কোল ইয়ার্ডে রয়েছে মাত্র ২ হাজার মেট্রিক টন। বাকি ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লার কোনও হদিস নেই। বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ায় এখানে প্রাথমিক তদন্তে দুর্নীতির সত্যতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে। ঢাকা থেকে দুদকের কর্মকর্তারা ঘটনার অধিকতর তদন্ত শেষেই আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’ সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

news portal website developers eCommerce Website Design