ছয় বছরে প্রতি বর্গফুটে চামড়ার দাম কমেছে ৪০ টাকা

Leather

দেশে সব ধরনের পণ্যের দাম প্রতিদিনই বাড়ছে। তবে প্রতিনিয়ত কমছে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। গত ছয় বছরে ক্রমান্বয়ে এই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ছয় বছর আগে বিক্রি হওয়া ৯০ টাকা বর্গফুট দরের গরুর চামড়া এবার বিক্রি হবে সর্বোচ্চ ৫০ টাকায়। সরকার এই দরই নির্ধারণ করে দিয়েছে। এখানেও শর্ত আছে। এই দাম পেতে হলে চামড়ায় লবণ মাখিয়ে দিতে হবে। লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া এবার বিক্রি করতে হবে সর্বোচ্চ ৫০ আর সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা। এভাবেই কমছে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। কারণ একটাই, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়াজাত পণ্যের বিক্রি ও চাহিদা উভয়ই কমে গেছে। এই এক অজুহাত দেখিয়েই দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা কোরবানির মৌসুম এলেই আহাজারি শুরু করেন। আর সেই আহাজারিতে দুর্বল হয়ে সরকারও দর কমিয়ে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়।

তাই তো জনমনে এখন প্রশ্ন, কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কবে বাড়বে? কারণ গত ছয় বছর ধরে কমছে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৩ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৮৫ আর সর্বোচ্চ ৯০ টাকা। একইভাবে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল সর্বনিম্ন ৫০ আর সর্বোচ্চ ৫৫ টাকা। ছয় বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে সেই লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০ আর সর্বনিম্ন ৪৫ টাকা। একইভাবে খাসির চামড়ার দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছে সর্বনিম্ন ১৩ আর সর্বোচ্চ ১৫ টাকা। দেখা গেছে, গত ছয় বছরে কোরবানির গরু ও খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে কমেছে ৪০ টাকা।

পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, ২০১৩ সালে সরকার নির্ধারিত দাম অনুযায়ী ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৮৫ থেকে ৯০ টাকা আর ঢাকার বাইরে ৭৫ থেকে ৮০ টাকা দরে কেনা হয়। সারাদেশে প্রতি বর্গফুট খাসির চামড়ার দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। ২০১৪ সালে প্রতি ফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা আর ঢাকার বাইরে এ দর ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। ২০১৫ সালে ঢাকায় প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৫০ থেকে ৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এছাড়া প্রতি বর্গফুট খাসির লবণযুক্ত চামড়া ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৬ সালে গরুর লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার প্রতি বর্গফুটের সর্বনিম্ন দাম ছিল ৫০ টাকা। খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। ২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার নির্ধারিত দাম ছিল ঢাকায় ৫০ থেকে ৫৫ ও ঢাকার বাইরে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। খাসির চামড়ার দাম সারাদেশে প্রতি বর্গফুট ২০ থেকে ২২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আর ২০১৮ সালের জন্য প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ৪৫ থেকে ৫০ টাকা। আর খাসির দর ঠিক করে দেওয়া হয়েছে ১৮ থেকে ২০ টাকা।

leatherচামড়া সংশ্লিষ্ট সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমছে। তাই বাংলাদেশেও এর দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। সংগঠনটি জানিয়েছে, এমনিতেই এ বছর চাহিদা কম। কারণ গত বছর কেনা চামড়া রয়ে গেছে ৪০ শতাংশ। তার ওপর আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা ক্রমাগতভাবে কমছে। ট্যানারি মালিকদের দুই সমিতি ও চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা বিভিন্নভাবে এবং বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে জানিয়েছেন, গত এক বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। কিন্তু রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি আয় ২ দশমিক ৬৯ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে আয় হয়েছে ১ হাজার ১৬১ কোটি ডলার।

আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম সম্পর্কে ‘ইনডেক্সমুডি’ নামের একটি ওয়েবসাইটে দেখানো হয়েছে, ‘২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে গরুর চামড়ার প্রতি পাউন্ডের দাম ছিল ৮৬ সেন্ট। ২০১৪ সালে তা বেড়ে ১ ডলার ১৫ সেন্ট পর্যন্ত উঠেছিল। ২০১৫ সালে দাম কমতে শুরু করে। এখন চামড়ার দাম প্রতি পাউন্ড ৭০ সেন্ট। দেশে বছরে মোট যে পরিমাণ চামড়া সংগৃহীত হয় তার ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ আসে কোরবানির ঈদের সময়। এর ফলে এ মৌসুমে সাশ্রয়ী দরে চামড়া কিনতে পারলে তা দিয়ে সারা বছর ভালো ব্যবসা করা যায়।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে দরপতন, বাংলাদেশি চামড়ার বাজারে মন্দা, ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির দরপতন কিন্তু টাকার দাম বৃদ্ধি, চামড়ার পুরোনো মজুত রয়ে যাওয়া- এসব কারণে এ বছর চামড়ার দর কমিয়ে ধরা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বলেন, ‘চামড়ার দাম নির্ধারণ করা না হলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাজার অস্থিতিশীল করে ফেলে। এতে যারা গরিব ও প্রকৃত কাঁচা চামড়ার টাকাটা পাবে তারা ন্যায্য দামটা পায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম ৩৩ শতাংশ কমেছে। তাই এ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা চামড়ার দামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।’

Leather

জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার অবস্থা আসলেই খারাপ। তাই গত বছরের তুলনায় এ বছর দর কমিয়ে চামড়ার দাম ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই এটি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চামড়া পাচাররোধে এরই মধ্যে সীমান্তে টহল জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এছাড়া চামড়ার সুষ্ঠু সংগ্রহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণসহ বেশ কিছু নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, সীমান্তে বিজিবির টহল রয়েছে, যা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোরবানির সময় চামড়া যাতে পাচার না হয় সেদিকে নজর রেখে বিজিবিকে টহল জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রতি বছর কোরবানি এলেই চামড়া ও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা সিন্ডিকেট করে নানা ধরনের অজুহাতে চামড়ার দাম কমান। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি।’

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]