কোরবানির বর্জ্যে কোটি টাকার বাণিজ্য!

কোরবানির দেওয়া গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার হাড়, শিং, অণ্ডকোষ, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রথলি, পাকস্থলী ও চর্বি সাধারণত ফেলে দেওয়া হয়। তবে এগুলো এখন আর ফেলনা নয়। এসব বর্জ্য থেকেই হচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য। বর্জ্যের মধ্যে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, জাপান ও চীনে গরু-মহিষের পেনিস বা লিঙ্গ অত্যন্ত দামি বস্তু। এ দিয়ে তৈরি স্যুপ ওইসব দেশে খুবই জনপ্রিয় ও দামি খাবার। ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। এসব দেশে পশুর একেকটি লিঙ্গ ৮-১০ ডলারে বিক্রি হয়। এছাড়া গরু-মহিষের দাঁত ও হাড় থেকে তৈরি হয় ক্যাপসুলের কাভার।

প্রতিবছর কোরবানির সময় এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে ব্যবসা করেন ব্যবসায়ীরা। পরে প্রক্রিয়াজাতের পর বিদেশে রফতানি করেন।

কোরবানির সময় ফেলে দেওয়া গরু-মহিষের এসব অঙ্গপ্রতঙ্গ ডাস্টবিন থেকে সংগ্রহ করে এক শ্রেণির শিশু শ্রমিকরা। পরে তারা নির্দিষ্ট স্থানে বিক্রির জন্য নিয়ে আসে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় থেকে তিন টাকা কেজি দরে পশুর হাড়, ২০-৩৫ টাকা দরে পশুর অণ্ডকোষ, ১২০ টাকা দরে পাকস্থলী, শিং ১০০ টাকা, চোয়ালের হাড় তিন টাকা কেজি দরে কিনে নেন ব্যবসায়ীরা।

এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লালবাগের রইসউদ্দিন বলেন, ‘বছরে একবারই আমরা এ ব্যবসাটা করি। বহুল প্রচারিত নয়, তারপরেও ভালো দাম পাই বলে বছরে একবারই এসব সংগ্রহে নামি। আমরা এগুলো সংগ্রহ করে কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে বিক্রি করে দেই। এগুলো কেনার জন্য লোকজন আসে। তাই বিক্রিতে ঝক্কি-ঝামেলা নাই, দাম ভালো।’

জানা গেছে, গরুর হাড়, শিং, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি, মূত্রনালি, চর্বি, রক্তের মতো বর্জ্যগুলো সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এগুলো কাজে লাগানো যেত। পশুর বর্জ্যের বড় বাজার হলো থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, চীন ও জাপান।

এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও প্রচার নিশ্চিত করা গেলেই কোরবানির পশুর বর্জ্য হয়ে উঠতে পারে দেশের অর্থনীতির অন্যতম একটি খাত।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, গত বছর পশুর বর্জ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ১৭০ কোটি টাকারও বেশি। আশা করা হচ্ছে, এ বছর এর পরিমাণ ২০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

সমিতি বলছে, এ বছর কোরবানির পশু থেকে দেড় থেকে দুই হাজার মণ বর্জ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। খাওয়ার পর ফেলে দেওয়া হাড় ডাস্টবিনসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহের জন্য কোরবানির সময় অতিরিক্ত শ্রমিক নেওয়া হচ্ছে গত বছর থেকে। এছাড়া, চামড়া থেকে আসা বর্জ্য সংগ্রহ করা হবে বিভিন্ন ট্যানারি থেকে।

ট্যানারি থেকে পাওয়া উচ্ছিষ্ট চামড়া দিয়ে তৈরি জুতার সোল ও প্রক্রিয়াজাত করা চামড়ার ফেলে দেওয়া অংশ থেকে সিরিশ কাগজ তৈরি হয়। পশুর রক্ত সংগ্রহের পর তা সেদ্ধ করা হয় এবং শুকিয়ে গুঁড়ো করা হয়। পরে সেই গুঁড়োর সঙ্গে শুঁটকি মাছ, সয়াবিন তেল ও যব মিলিয়ে তৈরি দানাদার মিশ্রণ ব্যহার করা হয় মুরগি ও পাখির খাবারের জন্য। পশুর চর্বি দিয়ে তৈরি হয় সাবান। আর শিং থেকে অডিও-ভিডিও ফিল্ম তৈরি হতো, ডিজিটাল ডিভাইসের বহুল ব্যবহারের কারণে যার চাহিদা অনেকটাই কমে গেছে। এখন শিংয়ের মূল ব্যবহার বোতাম ও চিরুনি তৈরিতে। আবার মহিষের শিংয়ের ডগা ব্যবহার করে জাপানে এক ধরনের খেলনা তৈরি করা হয়। গরু ও মহিষের নাড়ি প্রক্রিয়া করে মানুষের খাবারও তৈরি করা হয়। জাপানের জনপ্রিয় ও দামি ‘শোস্যাট রোল’ নামের খাবারটিও গরু ও মহিষের নাড়িভুঁড়ি দিয়েই তৈরি।

বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধু কোরবানির পশু থেকে এক হাজার মণ হাড়, ছয় হাজার কেজি লিঙ্গ ও ৫০০ মণ গোল্লা (নাড়িভুঁড়ি) সংগ্রহ করা হয়েছিল। সাধারণভাবে সমিতি সারাদেশ থেকে মাসে আড়াইশ মণ হাড় সংগ্রহ করতে পারে। সেই হিসাবে বছরজুড়ে সংগ্রহ করা হাড়ের এক-তৃতীয়াংশই আসে কোরবানির সময়। এ কারণে এসময় বর্জ্য সংগ্রহে লোকবল বাড়ানো হয়।

বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছর একশ ৭০ কোটি টাকার পশুর হাড়, যৌনাঙ্গ ও গোল্লা বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হয়েছে।

রাজধানীতে রয়েছে পশুর বর্জের বিশাল বাজার। বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জে রয়েছে এর দু’টি বাজার একটি জিঞ্জিরায়, অন্যটি হাসনাবাদ এলাকায়। আগে কেবল ঢাকার আশপাশ থেকে এই বাজারে শিং ও হাড় এলেও এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেই এই বাজারে আসছে গরু-মহিষের শিং ও হাড়। এখানে প্রতিমণ শিং ৬০০ টাকা ও প্রতিমণ হাড় বিক্রি হয় ৭০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা দরে।

স্থানীয়রা জানান, আগে টোকাইদের কাছ থেকে নগদ টাকা দিয়ে এসব বর্জ্য কেনা হতো। তবে এখন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই কেনা হয় এগুলো। সব মাল একসঙ্গে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয় সীমান্তে। ওপারের ব্যবসায়ীরা এসে সেখান থেকে মাল নিয়ে যায়। অনেক সময় ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি থাকে। তাদের দিয়েও মাল পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হাড় ও শিং একটু বেশি পরিষ্কার হলে ভালো দাম পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ মাংস বিক্রেতা সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, ‘বর্জ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতের বিষয়টিতে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। উৎসাহিত করলে এই খাত থেকেও কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। একইসঙ্গে এর প্রচার-প্রসারও প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গণমাধ্যমে এ বিষয়টি ঠিকভাবে উঠে এলে কেউ আর পশুর বর্জ্য ফেলে দেবে না।’ এ বিষয়ে তাই গণমাধ্যমকে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শুভাশীষ বোস বলেন, ‘এখনও বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের তালিকায় গরু মহিষের অঙ্গপ্রতঙ্গের নাম ওঠেনি। তবে গরু ও মহিষের শিংসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য রফতানির কথা আমিও শুনেছি।’

news portal website developers eCommerce Website Design
Close ads[X]