মুক্তিকামী কবি মাহমুদ দারবিশ-শাহরিয়ার সোহেল

প্রায় তিন হাজার বছরের ইতিহাস ফিলিস্তিনকে ঘিরে আবর্তিত। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টে এর বিশদ পরিচয় পাওয়া যায়। শত শত বৎসরের আবর্তনে এ অঞ্চলের নাম বহুবার পরিবর্তন হয়েছে। ফিলিস্তিয়া, ফিলিস্তিন, প্যালেস্টাইন, জুডিয়া, ইসরায়েল বহু নামে ভূষিত এ অঞ্চল। এ ভূখণ্ডের সীমানাও সর্বদা একই থাকেনি। কালের আবর্তনে পাল্টেছে এর সীমানা। মাহমুদ দারবিশ ফিলিস্তিন ফুঁড়ে জেগে ওঠা এক মুক্তিকামী অনবদ্য কবি।

 

প্যালেস্টাইন তিনটি প্রদেশের একটি গালিলি। উত্তর গালিলি অঞ্চলের আক্কা জেলার আল-বিরওয়েহ গ্রামে দারবিশের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৩ মার্চ। যখন তার বয়স মাত্র ৬, ১৯৪৮ এ ইসরায়েলি বাহিনী ওই গ্রাম দখল করে এবং ৪১৬ টি গ্রামসহ আল-বিরওয়েহকে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দেয়। জীবন বাঁচাতে দারবিশদের পরিবার লেবাননে পালিয়ে যায়। যখন দেশে ফেরেন, তখন ফিলিস্তিনি আরবদের আদম শুমারি শেষ হয়েছে, দেরি হলো তাদের এবং পরিচয় পত্র জোগাড়ে ব্যর্থ হলো। নিজ দেশ হলো পরভূমি। কর্তৃপক্ষের হাতে বারবার হয়রানির শিকার হলো। কখনো দেশে ফেরা, কখনো পালিয়ে যাওয়া, এভাবে চলতে লাগল। স্থায়ীভাবে দেশ ত্যাগ করেন ১৯৭১ সালে। ইসরাইল থেকে কায়রো যেয়ে আল আহরাম সংবাদ পত্রে কাজ করেন। দু’বছর পর বৈরুত গিয়ে পি এল ওতে যোগ দেন এবং ওই সংস্থারই ফিলিস্তিনি প্রসঙ্গ নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পান। ১৯৮৭ সালে পি এল ওর কার্যনির্বাহী পর্ষদের সদস্য হন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে পি এল ও এবং ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হলে তিনি পদত্যাগ করেন। পারীতে যেয়ে তিনি ফিলিস্তিনি সাহিত্যপত্র আল কার্মাল প্রকাশ করেন।

 

মাহমুদ দারবিশের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার প্রিয় কবিদের ভেতর ফরাসি কবি লুই আরাগ ও পল এলুয়ার, তুরস্কের নাজিম হিকমত, হিস্পানির ফেদেরিকো গার্থিয়া লোরকা, চিলোনের পাবলো নেরুদা অন্যতম। তাদের লেখা কবিকে আকর্ষিত করত। আধুনিক আরবি সাহিত্যে প্রতিরোধের কাব্য নামে একটি সাহিত্য ধারা গড়ে ওঠে, সে ধারার অন্যতম কবি ছিলেন মাহমুদ দারবিশ। ২৬ বছর বয়সে ১৯৯৬ সালে নির্বাসিত জীবনের পর স্বজন-বান্ধবদের সাথে দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়। তাকে পেয়ে সব ফিলিস্তিনি আনন্দে মেতে ওঠেন। তার কবিতা মানুষের মুখে মুখে আবৃত্তি হয়। তিনি বলেছিলেন,‘যতদিন আমার এ দেহে প্রাণ আছে আমার দেশ ফিলিস্তিনের জন্য আমার নস্টালজিয়ায় কেউ এতটুকুও আঁচড় কাটতে পারবে না।’

 

সিমন বিত নামে ইসরায়েলি-ফরাসি চলচ্চিত্রকার ১৯৯৭ সালে দারবিশের শৈশবের নিসর্গ দেখতে বিরওয়েহ গিয়েছিলেন; কিন্তু সেখানে ছিল শুধুই শূন্যতা, পরিত্যক্ত ঘাসপালা আর জঞ্জাল। ইসরায়েলি বুলডোজার সব স্থাপনা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছে। সেখানে; যে কোন দিন কোন নান্দনিক পাখি ডাকা ভোর ছিল, কুয়াশা মাখা গ্রাম ছিল তা বোঝার উপায় নেই। মাতৃভূমির চিহ্ন হয়ত নেই কিন্তু মাতৃভাষা জেগে আছে কবি হৃদয়ে। তাইতো কবি গেয়ে ওঠেন,

 

‘কে আমি? প্রশ্নটি জিজ্ঞেস করে সবাই অথচ উত্তর নেই।

আমিই আমার ভাষা এবং আমিই স্তোত্রপঙক্তি-একটি, দুটি, দশটি

আমিই আমার ভাষা। আমিই আমার ভাষা।’

 

২০১৪ সালেও ইসরাইল ফিলিস্তিনির ওপর নৃশংস আক্রমণ চালিয়েছে। ছোট ছোট ফুলের মতো শিশুদের রক্তাক্ত করেছে, বুট দিয়ে পাড়িয়েছে, পিচের রাস্তায় আছাড় মেরেছে, বুকের ওপর উঠে নারকীয় উল্লাসে লাফিয়েছে, নারীদের বস্ত্র হরণ করেছে, বেয়নটের খোঁচায় রক্তাক্ত করেছে কিশোরীদের, যত্রতত্র বোমা মেরেছে, নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করেছে। ঠিক সে সময়ে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু। সাম্বা নাচের মতো অসভ্য নাচে দিগ্বিদিক প্রকম্পিত। যুবতী নারীরা নগ্ন হয়ে সারা দেহে রঙ করে নেচেছে, সারা বিশ্বের মানুষ তা গোগ্রাসে চেখেছে, ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদের বিরুদ্ধে যে অত্যাচার; এর বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হয়নি। ক্ষমতাধর মুসলিম দেশগুলো-যারা অনিয়মের চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে, যারা নবীজির দেখানো পথ গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে রাজতন্ত্র বহাল রেখেছে। ইচ্ছে মতো নারী ভোগ করছে, একটি অকর্মণ্য জাতি, যারা শুধু প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ বিক্রী করে মহারাজ হয়ে বসে থাকে, তারা অত্যাচারিত মুসলিমদের কীভাবে পথ দেখাবে?পরে জানা গেছে, ইসরাইল যে সব মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেগুলোর অধিকাংশই ছিল আমেরিকার অস্ত্র।বিশ্ব শান্তির কথা য়ারা বলে, তারাই পুষে রাখে বিশ্ব সন্ত্রাস। এসবের বিরুদ্ধে উচ্চকিত ছিলেন কবি মাহমুদ দারবিশ। তিনি সত্য ও সুন্দরের পূজারি, কারণ তিনিতো কবি। প্রকৃত কবি কখনো অসত্যকে-মিথ্যাকে আগ্রাসন নীতিকে সমর্থন করে না। ফিলিস্তিন মুক্তির শান্তিদূত ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিনি সংগ্রাম, মাহমুদ দারবিশ এগুলো আজ স্বাধীনতার পক্ষের সমার্থক শব্দ। যুগ যুগ ধরে ফিলিস্তিনে মুসলমানরা অত্যাচারিত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রকৃত বিদ্রোহ হওয়া উচিত বিশ্বব্যাপী। মানবতার পক্ষে হবে মানুষের জয়গান। মানুষ পশু নয়, এটা প্রমাণ করার সময় এসেছে। কবি মাহমুদ দারবিশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন শব্দে শব্দে। তার প্রতি আমাদের নিরন্তর শ্রদ্ধা সর্বদা।

 

কবি মাহমুদ দারবিশ এমন একটি পৃথিবীর ছবি একেঁছেন, যেখানে ভিন্ন দেশ বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। কোথাও যেতে হলে পাসপোর্ট-ভিসার প্রয়োজন হবে না। শান্তিময় হবে পৃথিবী। কোন সংঘাত নয়, শুধু শান্তি আর আনন্দে ভরপুর থাকবে সব। তিনি বলেছেন,

 

‘এ কথা কি সত্যি যে মানুষের এই মাটির পৃথিবী সব মানুষেরই জন্যে?

বলি এমন সব দেশের কথাও যেখানে পাসপোর্ট লাগে না।’

 

দেশের প্রতি ভালবাসা, দেশ প্রেমে কবি হৃদয় সর্বদা মগ্ন থাকত। কোন শর্তেই মাতৃভূমিকে তিনি ফেলে যেতে চাননি, অস্বীকার করেন নি। শত নির্যাতন সহ্য করার পরও তার কাছে মাতৃভূমিই শ্রেষ্ঠ। মাতৃভূমির চেয়ে প্রিয় মাটি আর কিছুই হতে পারে না। লিখেছেন,

 

‘যদি বা কখনও ফিরি, তো ফিরে আসব

একই গোলাপের কাছে এবং একই

পদচিহ্ন রেখা ধরে।’

 

ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করা একজন নাগরিক পরিপূর্ণভাবে ফিলিস্তিনি। স্বপ্নে-জাগরণে-মেধা-মননে-শরীরে ফিলিস্তিনি। দেশ প্রেম কখনো পরাজিত হতে পারে না।

 

‘হে কন্যা

আঁখি দুটি তোমার ফিলিস্তিনি

ফিলিস্তিনি তোমার নাম

আভরণ ও বেদনা তোমার ফিলিস্তিনি

ফিলিস্তিনি তোমার রুমাল, পা দু’খানি, তনু অনুপম

তোমার মুখে কথা ও নীরবতা ফিলিস্তিনি

কণ্ঠের ধ্বনি মাধুরী তোমার ফিলিস্তিনি

আর জন্ম ও মৃত্যুও বটে ফিলিস্তিনি।’

 

নির্যাতিত, গৃহহারা মানুষের কষ্টের কোন শেষ নেই। সর্বদা যুদ্ধের তাণ্ডব, হাহাকারময় অবস্থা। যৌবনে বিয়ে করেও শান্তি নেই। ঘর নেই বউকে সোহাগ করার; কিন্তু মন যে মরিয়া, এ কষ্ট সহ্য করা খুবই মুশকিল।

 

‘এক তরুণ সদ্য বিয়ে করেছে;

অথচ বাসর শয্যার জায়গা নেই

সে বলে: বৌকে একটু

সোহাগ করি কোথায় বলুনতো!’

 

প্রিয়তমার প্রতি প্রেম অনিবার্য। দুজনই প্রাপ্ত বয়ষ্ক। দেখা হবে কোথাও নির্দিষ্টি করা হয়েছে। দুজনই উদগ্রীব সময়ের প্রতীক্ষায়। প্রিয়তম পৌঁছে গেছে নানা কারুকার্যের ভেতর থেকে। কিন্তু প্রিয়তমা আসছে না। প্রিয়তমার না বের হবার কোন কারণ নেই। সে অবশ্যই বেরিয়েছে। হয়ত পথে হায়েনারা ফুলের পাঁপড়ি ছিড়েছে, হয়ত ধর্ষণের পর হত্যা করেছে প্রিয়তমাকে অথবা লুট হয়ে গেছে সে, হয়ত কোন বুলেট কেড়ে নিয়েছে তার প্রাণ, রক্তাক্ত শরীর নিয়ে হয়ত সে নীথর। প্রিয়তম’র প্রতীক্ষা নিরন্তর চলছে। সে অপেক্ষা করছে প্রিয়তমা আসবে। কিন্তু দেশের অস্থিরতা আর ধ্বংস তার প্রিয়তমাকেও ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে।

 

‘আমার হাত দুটি ধরে

সে আমাকে ফিসফিস করে

বলেছিল তিনটি শব্দ

তার চেয়ে দামি কথা সারাদিন শুনিনি;

কাল ফের দেখা হবে, কেমন-

আর তার পরেই পথের ভিড়ে হারিয়ে গেল

কেটে গেল আধ ঘণ্টা

অত:পর পুরো একটি ঘণ্টা,

শেষে দু’ঘণ্টাও।

ছায়া দীর্ঘতর হয়

যে বলেছিল আসতে, কই সে এল না তো!’

 

দেশের নৈরাজ্যের জন্য আর সাম্প্রদায়িকতার জন্য যখন দেশের নারীরা হয় অসম্মানিত, তখন বিবেকের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে। প্রেমিকের কাছ থেকে প্রিয়তমাকে কেড়ে নিয়ে তাকে যদি একাধিক নরপশু আক্রমণ করে, তবে তার কিছুই করার থাকে না, তবু তার চোখ নিভৃতে লড়াই করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। প্রেমিক ততক্ষণে প্রচুর মার খেয়ে আহত-রক্তাক্ত। সুবিচার না থাকলে এমনই হয়। যেমনটি ঘটছে আমাদের দেশেও অহরহ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী ধর্ষণ, কখনো শততম ধর্ষণের সেঞ্চুরীর বিকৃত আনন্দ, কখনো মাইক্রোবাসে বা ট্রেনে বা ট্রাকে চলন্ত অবস্থায় ধর্ষণ। এসব যেন মুড়ি-মুড়কির মতো ব্যাপার। কোন আনন্দ উৎসবে নারীর শ্লীলতাহানী, বস্ত্রহরণ সবই যেন নিছক দুষ্টুমীতে পরিণত হয়, যখন দেশে সুবিচার থাকে না। মাহমুদ দারবিশ এ ধরণের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন তীব্রভাবে।

 

‘তারা কেড়ে নিল তার মুখের খাবার,

পোশাক আর পতাকা

তারপর ঠেলে ঢুকিয়ে দিল

ফাঁসির আসামির খুপরিতে

তার তরুণী প্রিয়তমাকে কেড়ে নিল তারা

সুন্দরী লড়ে যায় তার জ্বলন্ত চোখ দিয়ে।’

 

বারবার যারা মরে, তারা মৃত্যুকে আর  ভয় পায় না। মৃত্যুর পাশেই জীবন হয়ে বেঁচে থাকে। মৃত্যু তখন অনেক সহজ ও কাঙ্ক্ষিত, রক্ত তখন পানির চেয়েও অফুরন্ত। তাইতো কবি মৃত্যুকে জয় করেছেন মৃত্যু দিয়ে, তবু দেশের স্বাধীনতাকে বিপর্যস্ত করতে চান নি।

 

‘মৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে সে বলে;

হারাবার মতো আমার কিছু নেই;

আমার স্বাধীনতার পাশে আমি মুক্ত দাঁড়িয়ে আছি

আমার হাতেই আমার ভবিষ্যৎ

অতি সত্বর আমি গভীরে প্রবেশ করব

আমার জীবনের।’

 

অথবা

 

‘জীবনভর মৃত্যু নিয়ে বেঁচে থাকা

আর পুনর্বার মৃত্যুর ভিতরে মরে যাওয়া

উইলো বনানী, তুমি কি মনে রাখবে তাকে

ওরা যাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল তোমার বিষণ্ন ছায়ায়’

 

অথবা

 

‘প্রাসাদ থেকে মৃত্যু বেরিয়ে এসে ছড়িয়ে পড়েছে

বেতার থেকে বারাঙ্গনা থেকে সব্জিবাগান তক্।’

 

সবাই যেন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রক্তে ভিজে প্রিয়তমা যখন শেষ নি:শ্বাস ত্যাগের প্রতীক্ষায়, তখন তার আর কোন শেষ সম্বল নেই প্রিয়তম’র ওষ্ঠে একটু পানি দেবার। তাই মেঘকে অনুরোধ করে; পোষাক হয়ে যেন ঢেকে দেয় প্রিয়তমকে।

 

‘এক রমণী ডেকে বলে মেঘকে

আমার প্রিয়তমকে তুমি ঢেকে দাও

কেননা রক্তে ভেজা আমার পোষাক।’

 

এসব অসহ্য কষ্ট আর নির্যাতন সহ্য করতে করতে কখনো স্বাধীনতা, কখনো দেশ, এগুলি কী, কার জন্য এসব প্রয়োজন, এমনটি ভেবেছেন। জীবন কি দেশের চেয়েও বড়, নাকি দেশ বড়, দেশ কী ইত্যাদি প্রশ্ন কবিকে বিচলিত করে।শত্রুদের তাণ্ডবে দেশের অস্তিত্ব বিলীন। কেউ সেখানে বসবাস করতে পারছে না। শুধু রক্ত, শুধু হিংস্রতা, শুধু বন্যতা, শুধু ধ্বংস। দেশ যেন কখনো এক অলীক বস্তু। অদৃশ্য দেখার নিবেদিত প্রত্যাশা।

 

‘আমরা হাঁটি কোনো এক দেশের পানে যা আমাদের রক্তমাংসের নয়

তার কাঠবাদামের গাছও তৈরি নয় আমাদের হাড়ে

সলোমন বাদশার গানে কথিত

ভেড়ার কুঞ্চিত লোমের মতো নয় এদেশের পাথর

আমরা হাঁটি কোনো এক দেশের পানে

যেখানে আকাশে কোনো সূর্য থাকে না শুধুই আমাদের জন্যে

প্রাক পুরাণিক নারীদল হাততালি দেয়;

আমাদের চারপাশে দরিয়া

আমাদের ওপরে দরিয়া

নাগালের মধ্যে যদি গম আর পানি না থাকে, তো

তোমার খাদ্য হোক আমাদের প্রেম, পানীয় হোক আমাদের অশ্রুবারি

আমাদের কবিকূলের জন্যে আছে শোকের কালো ঘোমটা

তোমার ঘরে আছে তোমাদের জয়গাথা, আমাদেরও আছে আমাদের

আমাদের একটি দেশ আছে যেখানে আমরা

কেবলই দেখি অদৃশ্যকে, যা আর কেউই দেখতে পায় না।’

 

মার খেতে খেতে, ধ্বংস হতে হতে ফিলিস্তিনবাসীর এমন এক অবস্থা হয়েছে যে, তারা আর ভীত নয়। তাদের নিজস্ব পথ তারাই সৃষ্টি করে নেয়। মৃত্যুর ভয় না থাকলে জয়ী হওয়া অনেক সহজ।

 

‘কেউ আমাকে আমার কাছে নিয়ে যায়নি

পথ দেখিয়ে। গেছি আমি নিজেই।

মরুভূ ও দরিয়ার মাঝখানে আমিই

আমার পথ প্রদর্শক

আমিই পথিক এবং আমিই পথ।’

 

শত্রুপক্ষ চায় না ফিলিস্তিনের কেউ বেঁচে থাকুক। তাইতো সময়ে সময়ে শিশু হত্যা, নারী হত্যা করে। ইসরাইলের এক মন্ত্রী বলেছিল, ‘ফিলিস্তিনের সব মাকে ধ্বংস করো, যাতে আর কোন শিশু সেখানে জন্ম না নেয়।’ নব প্রজন্মদেরকেই ওদের বড় ভয়। ওরা কাপুরুষ, ওরা মাতাল, ওরা জানোয়ার। সত্য ও সুন্দর ওদের থেকে অনেক দূরে। মৃত্যুবরণ যখন করতেই হবে, তখন কবি মৃত্যুর ভেতর শৈল্পিকতা খোঁজেন।

 

‘তারা চায়, আমি মরে যাই

রাত্রের দেয়ালে আমি বিশটি বছর

ওদের পায়ের আওয়াজ শুনেছি

পৃথিবী হল বিশ্রী রকমের অন্ধকার

তোমার কবিতা তবে কেন এত ধবল শুভ্র?

আমি বলি-সুন্দরীতমাদের আমি যে ভালবাসতে চাই

তারা জিজ্ঞেস করে, কেমন মৃত্যু তুমি চাও?

নীল, অগণন তারকারাজি যেন জানলা দিয়ে ঢুকে পড়ে।’

 

পৃথিবীর এত আনন্দ, এত রূপ, এত বৈচিত্র্য সব ব্যর্থ হয়ে যায়, সব আবীলতায় মলীন হয়ে ওঠে, তবু যে ভালবাসা জেগে থাকে, যতই অস্ত্র ভয় দেখাক না কেন, ভালবাসা চিরন্তন। জীবনের মৃত্যু হয় কিন্তু প্রিয়তমার প্রতি ভালবাসা থাকে নিরন্তর অক্ষুণ্ন। কোন ভয় কবিকে

দমাতে পারে না।

 

‘রীতা ও আমার দৃষ্টির মাঝখানে

একটি রাইফেল

রীতার নাম আমার মুখে আনন্দ স্বাদ

রীতার শরীর আমার শোণিতে ফুলশয্যার উৎসব।’

 

জেরুজালেমের কষ্ট কবিকে ভাবায়, কবি চিন্তিত হন, মৃত্যু ব্যথায় আর্তনাদ করেন কিন্তু মৃত্যুকে ভুলে যান। চোখের সামনে দেখেন সত্য প্রিয়তমাকে; দেখেন দেশ, দেখেন মাতৃভূমি, দেখেন ভালবাসার মানুষকে। কবির কি আর মৃত্যু হয়, তার চেতনা চিরন্তনতা লাভ করে।

 

‘আমি হেঁটে চলি, যেন অন্য কেউ। আর

আমার ক্ষত বাইবেলের শ্বেত গোলাপ।

আমিতো হাঁটছি, উড়ে চলেছি,

হয়ে যাচ্ছি অন্য কেউ, রূপান্তরিত

ভূগোলবিহীন ও সময়হীন। আমি  কে?

তারপর কী? এক নারী সৈনিক চেঁচিয়ে ওঠে;

ফের তুই এখানে? তোকে কি আমি খুন করিনি?

আমি বলি: হ্যাঁ করেছ…কিন্তু

আমি যে তোমার মতোই মরতে ভুলে গেছি।’