দিলতাজ রহমান’র গল্প ‘মেঘে ফোটা তারা’ (শেষ পর্ব)

স্বাতীর কিছুই নেই গোছানোরযে কটা পোশাক তার সবই নতুনময়েন চাচার টাকায় কেনাফিরোজ সাহেবের স্ত্রীও কিছু কিনে দিয়েছেনবন্ধুরাও এটা ওটা গিফট দিয়ে যাচ্ছেকিন্তু জানছে না কেউই কী ঝড় গুমোট হয়ে আছে স্বাতীর পাঁজর ছেপেময়েন চাচার ঋত কী করে শোধ করবে সে? শেষ মুহূর্তে, যাওয়ার আগে চাচাকে শুধু বলে যাবে-‘আমার ফিরে আসা পর্যন্ত শুধু তুমি বেঁচে থেকো চাচা!’ এর বেশি ভাবতে পারার সাধ্য যে তার নেই! কথাও হয় না ময়েনের সঙ্গে তারতাই শেষ সময়ের জন্য ভেবে রেখেছে তাকে বলবার শেষ কথাটি

জর্জেটের নীলরঙের সালোয়ার কামিজ, ফিনফিনে নীল ওড়না শরীরের গোলাপি আভা ঢেকে দিয়ে নীলাভ করে রেখেছে স্বাতীকেহালকা প্রসাধন আর গাঢ় বিষণœতার মাখামাখি বহুদূরের আহ্বান বুকে নিয়ে যেন আশ্চর্য এক প্লাবনের ঢেউ সে, কোনো টানই যাকে আর ধরে রাখতে পারে নাকোনো ভারই যাকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে নাযেন শুধু ক্ষণকালের জন্য সে থমকে আছে, তার এটুকু সময়ের উপস্থিতি যেন এক আশ্চর্য আবহ তৈরি করে রেখেছে! তার গমনোন্মুখ ক্ষণ নাকি প্রসন্ন অবতরণচোখের পাতা যেভাবে স্বপ্ন ছোঁয়, ওর ভেতর যেন তেমনই আবেশ নেমে এসেছেহৃদয়কে মোহনাহীন নদী করে সে যেন ক্রমশ দিগন্তে মিশে যাওয়া ক্ষিপ্র গতির সাম্পানে ভাসা এক কল্পিত নারী মূর্তিআবিলতা যার চিত্তের সন্ধান কখনও পায়নিঅনেক চোখ যাকে দেখছে একই ভাবে এক অবিশ্বাস্য সত্যের অপরূপ লাবণ্যের আধেয় করেএকান্ত নিজস্ব সে অনুভূতি কাউকেই সুখি করবে না হয়তো

কিন্তু বেদনাকে মহার্ঘ্য করবে! আর যে বেদনা দূরকে কাছে টেনে এনে দেয়, তাও তো মহার্ঘ্যই! অনন্তের সব কিছু তা-তো করে তোলে নিজস্ব চিত্রকল্প!

প্রীতমকে খুব মনে পড়ে ওরবাবার বন্ধুর ছেলে প্রীতমওরা কানাডায় থাকেওর বাবা ওখানে চাকরি করেন, একটা বড় প্রতিষ্ঠানের চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্টনা, স্বাতী সব ভুলে যেতে চায়! কিছু শর্ত, কিছু আশা… শুধু পিছনে ফেরার ছল… মনটিকেও সে সেরকম করুণাগ্রাহী করে তুলবে নাপ্রীতম যখন সব জানবে তখন সে দ্বিধায় টলবেতার চেয়ে ভালো, এই দূরত্বের করে দেয়া মীমাংসা

ফিরোজ সাহেবের অফিসের গাড়ি গেটের কাছে হর্ন বাজাতেই মিসেস ফিরোজ স্বাতীর কালো কার্ডিগানটি হাতে নিয়ে উঠে পড়লোস্বাতীকে মাঝখানে বসিয়ে ফিরোজ সাহেব আর তার স্ত্রী দু’জন দু’পাশে বসেছেমাঝবয়সী ড্রাইভারের পাশে, সামনের সিটে তার কাছাকাছি বয়সের ময়েনকালো একটা পলিব্যাগে ভরে সে তার পুরনো মোটা উলের সোয়েটার, গামছা-লুঙ্গি গুছিয়ে ভরে রেখেছিলো দুপুরের আগেইবেলা পড়ে এলে কানটুপিটা খুঁজে মাথায় দিয়ে রেখেছিলোক’দিন ধরে তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিলো যেন সেও স্বাতীর সহযাত্রীপ্রবাসই তার আরাধ্য

রাত সাড়ে বারোটায় ফ্লাইটমালয়শিয়া এয়ারলাইন্সে যাচ্ছে স্বাতীবাসা থেকে বের হলো রাত আটটার দিকেরামপুরার রাস্তায় তখন গিজগিজে জ্যামরামপুরা এলাকায়ই ফিরোজ সাহেবের বাড়িযানজট না থাকলে এয়ারপোর্ট পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না এখান থেকেশীতের প্রথম দিকতবু সে নিজের ভেতর কু-লি পাকিয়ে আছেনাকি বিরহের টান, কিছুটা জড়তা সবাইকে গনগনিয়ে সেঁকে চলছে নরম ইটের মতোআর তারই তাপে বুঁদ হয়ে আছে ওরা সবাইএসময় বড় বেশি করে মা সাবিহা বেগমের মুখখানা মনে পড়িয়ে দিচ্ছে স্বাতীকে

ময়েন আজ আরো সংযত, গাড়ির গ্লাস ভেদ করে সে তাকিয়ে আছে বিমানবন্দরের দিকে, যতই এগোচ্ছে ততই সামিয়ানার মতো খুলে যাচ্ছে তার স্বপ্নের ভাঁজসে এখন তার স্বপ্নবাড়ির দিকে ধাবিতসেও আজ ওখানে ঢুকতে পারছেতার চৌদ্দপুরুষ যা কল্পনাও করতে পারে না। ‘আল্লা তুমি মাইয়াডার মনে শান্তি দিও, ওরে তুমি বড় কইরো! মানে-সম্মানে রাইহো।’ মনে মনে হাত তুলে মোনাজাত করে ময়েনহঠাৎ গাড়ির অপ্রতিরোধ্য গতি স্তিমিত হয়ে আসে

ক্রমশ খাড়া রাস্তা বেয়ে গাড়ি উপরের দিকে উঠতে যাবে, ময়েনের সেই আশ্চর্য প্রাসাদটির দিকে, ঠিক এমন সময় পুলিশ থামিয়ে দিলোপাস ছাড়া যাত্রীর সঙ্গে কেউ আর ওদিকে যেতে পারবে নাএখানেই নামতে হবেময়েনের পাস নেয়া হয়নিনামতে হলো তাকেএতক্ষণ নিশ্চল হয়ে থাকা স্বাতী ময়েনকে সালাম করবে ভেবে, মিসেস ফিরোজকে ঠেলে নামতে যাচ্ছিলো, কিন্তু পিছন থেকে তাড়ামুহূর্তে অনেকগুলো গাড়ি জমে গেছেএকসঙ্গে বহু মানুষের অসহিষ্ণু চিৎকার যেকোনো মানুষের রক্ত গরম করে দেয়, ড্রাইভার নিজের কান বাঁচাতে তড়িৎ গতিতে ছোটে

নিমিষে ময়েন দৃষ্টি এড়ালে স্বাতীর ভেজাচোখে নজর পড়ে অনুতপ্ত হয় ফিরোজ সাহেবস্বগতোক্তি করতে থাকেন তিনি… ভারি অন্যায় হয়ে গেছে… ময়েনের জন্য একটা পাস নেয়া উচিৎ ছিলো…কারো কোনো সায় বা প্রতিবাদ নেই তার কথায়তিনি একাই বলতে বলতে আবার বলতে লাগলেন… কিন্তু ওই আমার মাথাটা এমনভাবে ঘুলিয়ে রেখেছে… যেভাবে সব দায়িত্ব কাঁধে নিলো, রীতিমতো আমাকে ধান্ধায় ফেলে দিয়েছেও-স্বাতীর বাবা নয় তো? মিসেস ফিরোজ ক্ষীণ কণ্ঠে তিরস্কারের স্বরে বললেন, বুঝলেও সব কথা সবসময় বলতে নেই!’ আর তার কথা শুনে ফোঁপানো কান্নার ভিতর তক্ষুনি ডুকরে বলে ওঠে এতক্ষণ নিশ্চল বসে থাকা স্বাতী ‘মামা আর একবার শুধু একটু সময়ের জন্য ফেরা যায় না?

সারবাঁধা অসংখ্য গাড়ির সঙ্গে ফিরোজ সাহেবের গাড়িখানাও স্রোতের মতো চলে আসে লাউঞ্জের একেবারে সামনেযে আশ্চর্য প্রাসাদটি ময়েনউদ্দিনের অন্ধকার বাগানে জোনাকির মতো জ্বলছিলো, তারই ভিড় উপচানো, জমজমাট গেটে দ্রুত যাত্রীর টিকেটসহ দু’জনের পাস দেখিয়ে ব্যাগ এন্ড ব্যাগেজ-সমেত ওরা তিনজন ঢুকে পড়ে স্রোতের অনিবার্য গতি হয়ে

দীলতাজ রহমান’র গল্প ‘মেঘে ফোটা তারা’ : পর্ব-৩